পরস্পরের কৌশলের দিকে তাকিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

প্রতিপক্ষকে দেখে দলীয় প্রার্থী

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৫৬ | আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১০:০৬

প্রতীক ইজাজ

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত পুনঃতফসিল অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন দাখিল করতে পারবেন। ২ ডিসেম্বর বাছাই। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা। ভোট ৩০ ডিসেম্বর। সে হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার সময় আছে দুই সপ্তাহেরও কম।

কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি কোনো দলই। এ কাজে অন্তত আরো ৭-১০ দিন সময় লাগতে পারে বলে দলগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শেষ করেছে। বিএনপির সাক্ষাৎকার আগামীকাল। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার ২০ নভেম্বর। এরপর দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় চূড়ান্ত হবে দলীয় প্রার্থী।

ফলে প্রার্থিতা নিয়ে খুবই উদ্বেগে রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। দল থেকে ফরম কিনে তা জমাও দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনে। দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরুর পর থেকে তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ভিড় করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসা ও কার্যালয়ে। মনোনয়ন বোর্ডে আছেন এমন নেতাদের কাছের ছুটছেন তারা। অপেক্ষা যেন আর সইছে না। তারা জানান, মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে তারা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন। প্রচারণায় নামবেন।

অবশ্য দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর কষতে হচ্ছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি তাকিয়ে পরস্পরের দিকে। সতর্ক নজর বিপক্ষ দলের প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশলের দিকে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীনদের জন্য বাড়তি চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট কোন আসনে কাকে প্রার্থী করে তা জেনেই দলীয় প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে চায় ক্ষমতাসীনরা। একইভাবে বিএনপিও চাইছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বুঝে নিজেদের প্রার্থী নিশ্চিত করতে। এ জন্য দুই দলই দুই ধরনের তালিকা প্রস্তুত রেখেছে। প্রতিপক্ষ বুঝে সে তালিকা অনুযায়ী, কাটছাঁট হবে প্রার্থী তালিকা।

অবশ্য প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির বিষয়টাও ভাবতে হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকেও প্রার্থী নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। দলগুলো একাধিক প্রার্থী পরিহার করতে প্রার্থী ঘোষণার আগে আসনের ব্যাপারে সমঝোতায় যেতে চাইছে। এ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনাও হচ্ছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল, জোটের বাইরে জাতীয় পার্টি ও যুক্তফ্রন্টের। একইভাবে বিএনপিকেও আলোচনা করতে হচ্ছে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেও। এসব সমাধান করে তবেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করবে দলগুলো।

এবার জোটভিত্তিক নির্বাচন দেখতে হচ্ছে বলে জানান দলের নীতি নির্ধারকরা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, যেখানে আমাদেও জোটের প্রার্থী থাকবে সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রাখা হচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে সব আসইেন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করব। আমরা চাই, এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হোক। প্রয়োজনে মহাজোটকে ছাড় দিয়ে আমাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করব।

অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত। কোনো সমস্যা নেই। জোটের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে নির্বাচন নির্ভর করছে সরকারের ওপর। সরকার চাইলে নির্বাচন হবে।

বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী দেখে আওয়ামী লীগের প্রার্থী : দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে এরই মধ্যে দুই দফা বৈঠক করেছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড। এসব বৈঠকে দলীয় জরিপ প্রাধান্য পেলেও দেশি-বিদেশি আরো কিছু জরিপকেও আমলে নেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রমতে, ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত প্রায় শেষের দিকে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত করা যাবে। কিন্তু ঘোষণা দেওয়া হবে একেবারেই শেষ মুহূর্তে। কারণ বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন দেখেই প্রার্থী ঘোষণা করবে আওয়ামী লীগ। তাদের প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে প্রয়োজনে প্রার্থী বদল করে শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়া হবে। সে কারণে চূড়ান্ত তালিকায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে বাদ পড়তে পারেন কেউ কেউ। আবার বিরোধী দলের প্রার্থী বিবেচনায় খুলতে পারে কারো কপাল।

দলীয় সূত্রগুলো এমনও জানায়, দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে মহাজোটের প্রার্থীকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে আওয়ামী লীগে। যেখানে মহাজোটের শক্তিশালী প্রার্থী আছেন, সেখানে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থী দেবে না। তবে দলীয় প্রার্থী তালিকায় তাদের নাম ঘোষণা করা হবে। কারণ হিসেবে দলের নীতি নির্ধারকরা জানান, কোনো কারণে বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে সেখানে যেন কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত না হয় সে জন্য দলীয় প্রার্থী রাখা হবে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে সারা দেশে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে আওয়ামী লীগ। ওই তালিকা দেখেই আওয়ামী লীগের বা জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

বিএনপি তাকিয়ে আওয়ামী লীগের দিকে : জয় নিশ্চিত করতে প্রতিপক্ষ অর্থাৎ আওয়ামী লীগ, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী দেখে দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। সে জন্য প্রার্থী বাছাইয়ে আরো সময় নিতে চায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী কে কোথায় তাও পর্যবেক্ষণ করতে চায় তারা। ২৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে জোট ও ফ্রন্ট। এর আগে তারা ঘোষণা দিতে চায় না। দলের নীতি নির্ধারকরা এমনই জানিয়েছেন।

অবশ্য প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দলকে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়টিও ভাবতে হচ্ছে। দলীয় সূত্রমতে, এবার বিএনপির সামনে তিন চ্যালেঞ্জ। একদিকে ২০ দলীয় শরিক দল ও নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী; অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই দুই জোটকে সন্তুষ্ট করে প্রার্থী বাছাই করতে হচ্ছে।

কারণ হিসেবে দলের নীতি নির্ধারকরা জানান, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের পক্ষ থেকে দলটির কাছে এরই মধ্যে অন্তত ২০০ আসন দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ দলের দাবি ১৫০। এ ছাড়া ৩০০ আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি আগ্রহী প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন ফরম তুলেছেন। এসব দাবি ও চাহিদা সমন্বয় করে ৩০০ আসনে একক ও যোগ্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা বিএনপির হাইকমান্ডের জন্য অনেকটা কঠিন হবে বলে মনে করছে দল।

তবে আসন বণ্টন বিএনপির জন্য এবার খুব একটা চ্যালেঞ্জিং হবে না বলে মনে করছেন দলের নীতি নির্ধারকরা। তারা জানান, জোট ও ফ্রন্টে যোগ্যতা থাকলে সবাইকে প্রার্থী করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দলের পুরনো নেতা ও আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। সে ক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজেরে তরুণদের মনোনয়ন দেওয়া হবে এবার। এ ছাড়া নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকেও সংসদে রাখার পক্ষে দল।

পিডিএসও/তাজ