আজ সেই ভয়াল সিডর দিবস

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১১:১৯ | আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৫৪

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

আজ সেই প্রলয়ঙ্করী ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের ওই রাতে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় ‘সিডরের’ আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। শত শত মানুষ, গবাদি পশু ও বন্যপ্রাণীর জীবন প্রদীপ নিভে যায়। নিখোঁজ হয় বহু মানুষ। দুর্যোগের আগের দিনও যে জনপদ ছিল মানুষের কোলাহলে মুখরিত, প্রাণচাঞ্চল্য ছিল শিশু কিশোরদের। মাঠজুড়ে ছিল কাঁচা-পাকা সোনালি ধানের সমারোহ, পর দিনই সেই জনপদ পরিণত হয় মৃতের ভাগাড়ে। ১১ বছর পর সেই স্মৃতি নিয়ে এখনো সেখানকার মানুষ বেঁচে আছেন। তাদের অধিকাংশই হারিয়েছেন স্বজন। সেই

বিভীষিকাময় দিনটি মনে পড়লেই এখনো আঁতকে ওঠেন তারা। উপকূলের মানুষের স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে শত শত মানুষের চিৎকার আর স্বজনদের আহাজারি। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট।

পটুয়াখালী ও মির্জাগঞ্জ : ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেউ ঘর তুলতে এনজিওগুলোর দ্বারস্থ হয়ে ফের ঋণের জালে আটকা পড়ছে। সেই সুযোগে রমরমা ব্যবসা করছে এনজিওরা। এখনো ঝুঁকিমুক্ত নন উপকূলীয় ৪ কোটি মানুষ। ঘূর্ণিঝড় সিডরে ও জলোচ্ছ্বাস ২২টি জেলায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মারা যায়। ক্ষয়ক্ষতি হয় হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ফসল, গাছপালা, বাড়িঘরসহ অন্যান্য সম্পদের। ক্ষয়িক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা ধারণা করা হয়। গলাচিপার শতাধিক চরের মধ্যে ৩৭টি চরে জনবসিত রয়েছে।

এর মধ্যে ইউনিয়ন ৭টি চরকাজল, চরবিশ্বাস, চরমোন্তাজ, রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া ও চালিতাবুনিয়ায় লক্ষাধিক মানুষ বাস করে। সিডরে প্রতিটি চরই লন্ডভন্ড হয়ে যায়। চরলতা, চরহেয়ার, চরগঙ্গা, চরহালিম, চরকাশেম, চরকানকুনিপাড়া, চরযমুনা, চরকারফারমা, চরলহ্মী, চরআন্ডার শতকরা ৯৯ ভাগ ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। উপজেলার চাষাবাদকৃত ৫১ হাজার হেক্টর জমির ৭০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

সেই দিনের কথা মনে করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন উপজেলার চরআন্ডা গ্রামের সর্বস্ব খোয়ানো ধলন মৃধা (৩৭)। তিনি জানান, সেই রাতেও পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন ঘরে। কিন্তু রাত ৯টা বাজতেই শব্দ শুনতে পান প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের গর্জন। আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার আর সুযোগ হয়নি। সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ এসে আঁছড়ে পরে তাদের গোটা পরিবারের ওপর। সমানতালে চলে ঝড়ের তান্ডব। মুহূর্তে গোটা পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিশাল ঢেউ সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পাশের বনের গাছ ধরে সারারাত যুদ্ধ করে তিনি কোনো মতে বেঁচে যান। ঝড়ের পরের দিন আমি খুঁজে পান তার স্ত্রী মৃত হামিদা বেগম, মা সাহেরা বেগম এবং দুই পুত্র মেহেদী (৬) ও মিরনের (৮) লাশ। শ্যালক ইব্রাহীমের লাশ পাওয়া যায় সাগরে। কিন্তু বাবা ও তিন মাসের মেয়ে ময়নার কোনো খোঁজ পাননি আজও।

এদিকে, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে সিডরের আঘাতে ১০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং ১১৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানিসহ অনেক সম্পদের ক্ষতি হয়। আংশিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় ১৪ হাজার ৫০০ ঘর, গবাদিপশু মারা যায় ২ হাজার ৫০০, হাঁস-মুরগি মারা যায় ১ লাখ ৩০ হাজার, ফসল বিনষ্ট হয় ১১ হাজার ৯৯০ একর জমির, ৭ হাজার ৯৮৭টি পুকুরের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়, এছাড়াও উপজেলার ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪০টি মসজিদ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়, ৩৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১৫৬ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ও ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে বিধ্বস্ত হয় ১ হাজার ১৭০টি ঘর এবং মৃত্যু ঘটে ৮৫ জনের। এর মধ্যে চরখালী গ্রামে মারা যায় ৪৫ জন।

সিডরে মারা যাওয়া লাশগুলো চরখালী খান বাড়ির পুকুর পাড়ে ২৪টি কবরে ৩৩টি লাশ দাফন করা হয়। গণকবরটি এখন অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে। উপজেলার কপালভেরা গ্রামের পালোয়ান বাড়িতে একই ঘরে স্বামী-স্ত্রীসহ মারা যায় ছয়জন।

মেন্দিয়াবাদ গ্রামের মাজেদা বেগম বলেন, পায়রা নদী থেকে ৪০ ফুট দূরে ছিল তার ঘর। সিডরের পর দিন ঘরের একটি খুঁটিও খুঁজে পায়নি সে। মাজেদা বেগমসহ এ রকম জমি না থাকা এ এলাকার ৬টি পরিবারকে থাকার জন্য রানীপুর গ্রামের ইসমাইল হাজী মেন্দিয়াবাদ গ্রামের ২০ শতাংশ জমি দান করেন। সেই থেকে এখানেই তাদের বসবাস। মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত যারা এখনো ঘর পাননি তাদের জন্য উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে মোট ২৮২টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের কাজ চলমান আছে।

আমতলী (বরগুনা) : ১৫ নভেম্বর ২০০৭ ভয়াল এই দিনে আমতলী উপজেলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চল লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় সিডর। সিডরের তান্ডবে আমতলী উপজেলার ৩৮৬ জন মানুষ প্রাণ হারায়।

আমতলী উপজেলাসহ উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় ২৩০ কিলোমিটার ছিল শুধু ধ্বংসযজ্ঞ আর লাশের স্তূপ। এই জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার ৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫৫ কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছিল উপজেলার ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্বজনহারা মানুষরা মিলাদ মাহফিল, দোয়া মোনাজাত, কোরআনখানি ও নানাবিধ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা দিনটিকে স্মরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয়রা।

বাগেরহাট : বছরঘুরে দিনটি আসলেই গুমরে কাঁদে বাগেরহাটের শরণখোলাবাসী। ক্ষোভে-দুঃখে স্বজন হারাদের একটাই আক্ষেপ তখন যদি উঁচু এবং টেকসই বেড়িবাঁধ থাকত তাহলে তাদের আপন মানুষগুলো চোখের সামনে থেকে চিরদিনের জন্য চলে যেতে হতো না। কিন্তু সিডরের ১১ বছর পরও শরণখোলাবাসীর সেই কাক্সিক্ষত দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

সিডর বিধ্বস্ত বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ পোল্ডারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩ বছর মেয়াদি প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। চীনের ‘সিএইচডব্লিউই’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু মেয়াদ প্রায় শেষের পথে অথচ ৫০ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি। এই প্রকল্প ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত আরো ২ বছর কাজের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। নদী শাসনের ব্যবস্থা না করে বাঁধ নির্মাণ করায় তা বার বার নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে শঙ্কা কাটছে না এলাকার মানুষের।

বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের স্থানীয় প্রকৌশলী শ্যামল কুমার দত্ত জানান, ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি শুরু হওয়া ৩৫/১ পোল্ডারের ৬৩.২ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের কাজ ৩ বছরে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত ৫০ ভাগ কাজ শেষ করতে পেড়েছে। বেড়িবাঁধটি টপে চওড়ায় ৪.৫০ মিটার এবং বর্তমানের চেয়ে জায়গা বিশেষ দুই থেকে আড়াই মিটার উঁচু হবে।

এ পোল্ডারে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৯ জন। প্রকল্পের কাজের মধ্যে বলেশ্বর নদীতীর এলাকার ১১.৭৫০ কিমি সিসি ব্লকের কাজ, ১৫টি ড্রেনেজ স্লুইসগেট, ১৭টি ফ্লাসিং স্লুইসগেট ও ৫টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র দেড় কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ ধরা হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পিডিএসও/তাজ