নির্বাচনী সহিংসতা রুখতে মহাপরিকল্পনা পুলিশের

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:১৪ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৩

জুবায়ের চৌধুরী

আসছে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে তফসিলও ঘোষণা হয়েছে। এখন প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতিক দলগুলো। দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই সরগরম হয়ে উঠছে ভোটের রাজনীতি। এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমার কার্যক্রম শেষ করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আজ বুধবার থেকে মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শুরু করবে দলটি।

অন্যদিকে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বামজোটসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমার কার্যক্রম শুরু করেছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো এখন উৎসবের আমেজ। নির্বাচনী হাওয়া বইছে চায়ের দোকান, গণপরিবহন থেকে শুরু করে সব জায়গায়। ভোটারদের মধ্যেও চলছে নানা জল্পনাকল্পনা আর আলোচনা-সমালোচনা। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে পুরোদমে প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচনের মাঠ যখন সরগরম তখন নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে ‘ভয়’ আর ‘শঙ্কা’ ভর করছে জনসাধারণের মনে। কারণ গত ১০ নভেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবরে মনোনয়ন নিতে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষের মধ্যেই একটি পিকআপের চাপায় আরিফ ও সুজন নামে দুজন নিহত হন।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, নির্বাচনী সহিংসতা রুখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে তারা। এর অংশ হিসেবে গত সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দফতরে মাসিক অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল নির্বাচনী সহিংসতা। নির্বাচনে সহিংসতা হতে পারে—এমন শঙ্কা ব্যক্ত করে সভায় খোদ ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন ঘিরে কোনো জঙ্গি হামলার হুমকি না থাকলে জামিনে মুক্ত জঙ্গিদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে গোয়েন্দারা। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা এলাকার ছোট-বড় সন্ত্রাসীদের তালিকা ধরে অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

ডিএমপি সূত্র জানায়, নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ডিএমপি সদর দফতরের ওই মাসিক সভায় ঝুঁকিপূর্ণ আসন চিহ্নিত করতে রাজধানীকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। পুলিশের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোকে এক ক্যাটাগরিতে, এরপর কম ঝুঁকিপূর্ণ ও কম গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোকে বাকি দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এই তিন ক্যাটাগরির আসনগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক পৃথকভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে আসনগুলোতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কোন্দলও বিবেচনায় আনতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যখন যা ঘটবে তাৎক্ষণিকভাবে তা সিনিয়র কর্মকর্তাদের জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো তথ্য আড়াল করা যাবে না। সুই পরিমাণ কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।

এদিকে সারা দেশের নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মিডিয়া সোহেল রানা জানিয়েছেন, নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা করা হয়েছে। এসব আসনে যাতে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতি নিতেই এসব আসন তালিকা করে আলাদা করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজ। তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় মহাপরিকল্পনা সাজিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবগুলো সংস্থা একযোগে কাজ করবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে রায়ট গিয়ার বাধ্যতামূলক : দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কিছু বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার। দায়িত্ব পালনের সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট, লেগ গার্ড ও রায়ট গিয়ারসামগ্রী বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে বলেছেন তিনি। পাশাপাশি ডিউটির সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। নির্বাচনে কোনো গোষ্ঠী সহিংসতার চেষ্টা করতে পারে, চড়াও হতে পারে পুলিশের ওপর। তাই পুলিশকে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে রায়ট গিয়ারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সভায় উপস্থিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ : নির্বাচনী আচরণবিধি যারা ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও জারি করেছে পুলিশ। গত সোমবারের বৈঠকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনাও দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। সভায় কমিশনার বলেন, সবকিছু মাথায় রেখেই নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনী আচরণবিধি যেই লঙ্ঘন করুক না কেন, তিনি যে দলেরই হোক না কেন, তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না, দেবেন না।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি : নির্বাচন কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা রোধে পুলিশ সদর দফতর ও এলিট ফোর্স র‌্যাব থেকে মাঠপর্যায়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র। সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীতে বাড়ানো হয়েছে র‌্যাব-পুলিশের টহল, নগরীর প্রবেশদ্বারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পোশাকধারী বাড়তি পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বিপুলসংখ্যক সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ। সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামান।

র‌্যাবের পরিচালক (মিডিয়া) কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, শুধু রাজধানী নয়, দেশব্যাপী র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে, যেন জননিরাপত্তার বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য সারা দেশে র‌্যাবের প্রতিটি ব্যাটালিয়নের টহল জোরদার করা হয়েছে।

রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেফতার নিষিদ্ধ : পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে কাউকে গ্রেফতার না করার নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সম্প্রতি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে কোনো রাজনৈতিক মামলাও করা যাবে না বলে এই নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক ডিসি-এডিসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করেন। তারা জানান, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় নতুন করে আর রাজনৈতিক মামলা ও ধরপাকড় নিষেধ করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা রয়েছে বা যারা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, তাদের গ্রেফতারে কোনো সমস্যা নেই। এ ছাড়া রাস্তায় সরাসরি কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল