নির্বাচন ২৩ ডিসেম্বর

জাতির উদ্দেশে সিইসির ভাষণ

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৪০ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৪৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ১৯ নভেম্বর, বাছাই ২২ নভেম্বর এবং প্রত্যাহার ২৯ নভেম্বর। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে এ তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। সিইসি তার ভাষণে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানান। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার আশ্বাস এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অসামরিক প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান) মোতায়েনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থেকে থাকলে রাজনৈতিকভাবে মীমাংসারও অনুরোধ জানাই। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সিইসি। এদিকে, তফসিল ঘোষণার পর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল এ তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। অপরদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা ছাড়াই তফসিল ঘোষণায় অস্থিরতা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ। এর আগেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের ফল না আসা পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা না করতে ইসিকে অনুরোধ জানিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অপরদিকে, পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারই তফসিল ঘোষণা করতে ইসিকে পাল্টা অনুরোধ জানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকালই তফসিল ঘোষণা করল সিইসি।

ভাষণে সিইসি সব দলের অংশগ্রহণ ও সহিংসতায় না জড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জনগণের মালিকানার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়; নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্র তৈরি হয়। প্রত্যেক দলকে একে অপরের প্রতি সহনশীল, সম্মানজনক এবং রাজনীতিসুলভ আচরণ করার অনুরোধ জানাই। সব রাজনৈতিক দলের অংশ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করি।

‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে প্রার্থীর সমর্থকদের সরব উপস্থিতিতে অনিয়ম প্রতিহত হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনো প্রতিহিংসা বা সহিংসতায় পরিণত না হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাই।’

এর আগে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ ইসির নিবন্ধিত বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। এবারও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলেও সহিংসতা নেই। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে দফায় দফায় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট তফসিল পেছানোর দাবির প্রেক্ষাপটে সিইসি বলেন, ২৮ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ক্ষণ-গণনা শুরু হয়ে গেছে। কমিশনারগণ সংবিধানের আলোকে সংসদ নির্বাচন পরিচালনার শপথ নিয়েছেন। নির্বাচনী সামগ্রী ক্রয় এবং মুদ্রণের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে পারস্পরিক পরামর্শ আদান-প্রদান করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনী দায়িত্বে নিবেদিত রয়েছেন।

কমিশনের প্রস্তুতির দিকগুলো তুলে ধরে সিইসি বলেন, ‘আমরা একাদশক সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইন সংস্কার, ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ ৭টি করণীয় স্থির করে ২০১৭ সালে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলাম। সংলাপের মাধ্যমে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক সংস্থা, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নারীনেত্রী সংগঠনের কাছে কর্মপরিকল্পনাটি তুলে ধরেছিলাম। তাদের পরামর্শ এবং সুপারিশ বিচার-বিশ্লেষণের পর করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেমন—কতিপয় আইন ও বিধি সংশোধন করা হয়েছে। সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রের বাছাই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৭৫টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। কর্মকর্তাগণের সক্ষমতা অর্জন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। প্রথমবারের মতো পোলিং এজেন্টগণের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, বিএনপির এমন অভিযোগের ব্যাপারে সিইসি বলেন, ভোটার, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রার্থী, প্রার্থীর সমর্থক এবং এজেন্ট যেন বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হন বা মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন না হন তার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কঠোর নির্দেশ থাকবে। দলমত নির্বিশেষে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ধর্ম, জাত, বর্ণ ও নারী-পুরুষভেদে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোট শেষে নিজ নিজ বাসস্থানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে। সবার জন্য অভিন্ন আচরণ ও সমান সুযোগ সৃষ্টির অনুকূলে নির্বাচনে ‘লেভেল পেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে। এ সব নিয়ে শিগগিরই প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারি করা হবে।

ভাষণে তিনি বলেন, জাতির এমন উচ্ছ্বসিত প্রস্তুতির মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রত্যাশা করব, অনুরোধ করব এবং দাবি করব; প্রার্থী এবং তার সমর্থক নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি মেনে চলবেন। প্রত্যেক ভোটার অবাধে এবং স্বাধীন বিবেক পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করবেন। স্ব-স্ব এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোটকেন্দ্রে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সহায়তা করবেন। পোলিং এজেন্টগণ ফলাফলের তালিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করবেন। নির্বাচনী কর্মকর্তাগণ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে অটল থাকবেন। নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটগণ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটকেন্দ্র, ভোটার, প্রার্থী, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং এজেন্টগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। গণমাধ্যমকর্মী বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশ করবেন। পর্যবেক্ষকগণ নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা মেনে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সামগ্রিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবে। সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে।

নির্বাচনে বাজেট ও ভোটার : জাতীয় নির্বাচনের বাজেট ধরা হয়েছে ৭০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আর আইনশৃঙ্খলা খাতে ব্যয় ৪০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। এদিকে, ইসির সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩২৯ জন ও নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ১৫১ জন। ভোটকেন্দ্র ৪১ হাজার ১৯৯টি। ভোটকক্ষ ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪০টি। এতে সাত লাখের বেশি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ করা হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল