নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ

ইসির সামনে ৫ চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩৮ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১৩:৩৫

গাজী শাহনেওয়াজ

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ৫ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এই চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে—নির্বাচনের দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কব্জায় রাখা। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের ভূমিকা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেদিকটি নিশ্চিত করতে হবে। আরপিও সংশোধন করতে সংসদে আইন পাস হলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে কমিশন। ইভিএম ব্যবহার ইস্যুতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও ভোটারের সন্তুষ্টিও ইসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সংসদ নির্বাচনে কমিশন চাইলে নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার (আরও) হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন; তবে ডিসিদের পাশাপাশি নিজস্ব কর্মকর্তাদের ‘আরও’ করলে প্রশাসনের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর এই আস্থা নির্বাচন কমিশনকে অর্জন করতে হবে যে, সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি নিরপেক্ষ। একই সঙ্গে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য নিরপেক্ষ বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভোটের কাজে সম্পৃক্ত করার বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে।

তফসিল ঘোষণার আগে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এখন থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হচ্ছে কমিশনকে। কিন্তু দ্বিধা-বিভক্তি এবং বিতর্কিত মন্তব্যে কিছুটা সংকটে পড়েছে কমিশন। এতে নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরুর আগে ইসির প্রতি কয়েকটি রাজনৈতিক দলে মধ্যে কিছুটা অনাস্থা তৈরি করেছে। এখন আগে পিছে না ভেবে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে যা যা করণীয় সেগুলো সক্ষমতার সঙ্গে মোকাবিলা করে তফসিল ঘোষণার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে মনোযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে কমিশন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি দল ইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একই আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন অন্যদের দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে কী পদক্ষেপ নেয় সেই দিকেই দৃষ্টি সবার।

এদিকে, নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, এ নিয়ে দেশজুড়ে রয়েছে নানা আলোচনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। নির্বাচন চলাকালে উপজেলা, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদে ছড়িয়েপড়েছিল নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত পুলিশের ভূমিকা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে সাতক্ষীরা জেলার পুলিশ সুপারসসহ সব থানার ওসিদের কমিশনে তলব করে ভর্ৎসনা করেন সাবেক কমিশন।

অযাচিত কর্মকাণ্ডের কারণে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে পুলিশ সুপারের প্রত্যাহার চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দেশের প্রায় ৬০ জন পুলিশের বিরুদ্ধে নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েও তার সদুত্তর পায়নি কমিশন। এখন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ বাহিনীর প্রতি এখনই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কমিশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত—এভাবেই নিশ্চিত করতে হবে মাঠ প্রশাসন।

ইভিএমে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ যে সম্ভব তা প্রমাণ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে। এর জন্য তফসিল ঘোষণার আগেই এই যন্ত্রের সম্ভাবনাগুলো জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। ইভিএমে যে ভোট কারচুপির সুযোগ কম সেটা ফলাও করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। যাতে রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।

সংসদ নির্বাচনে সব সময় ডিসিরা রিটার্নিং অফিসার হন। গত কয়েকটি নির্বাচন থেকে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের দাবি উঠছে। তবে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তার দরকার হয়, এ কারণে তাদের বাইরে অন্য কাউকে রিটার্নিং অফিসার করার জন্য উৎসাহিত হয়নি ইসি। তবে নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলে প্রশাসন যাতে ইসির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে না পারে সেজন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে কমিশনকে। এর জন্য আইনটি সামনে এনে নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অফিসারদের সর্তক করতে পদক্ষেপ নিতে পারে ইসি। নির্বাচনে অনিয়ম করলে চাকরি যাবে এ ভয়ে তারা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন করতে পারে।

বিএনপিবিহীন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে তফসিল দিয়েছিল কমিশন। তবে পরিস্থিতি নির্বাচন বর্জনকারীদের বিপক্ষে যাওয়ায় তারা ভোট বন্ধে জ্বালাও পোড়াও শুরু করে। তবুও তারা নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। এবার সে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিএনপিসহ সবাই নির্বাচনে আসতে মরিয়া, সেজন্য সব দল চাচ্ছে সমান সুযোগ এবং ইসির নিরপেক্ষতা। কিন্তু কমিশনের মধ্যে অন্তঃকলহ প্রকাশ্যে চলে আসায় এখন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে সরকারবিরোধী শিবিরে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে কমিশনকে দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে এখন থেকেই সব দলকে আস্থাতে ফেরাতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনের প্রতিবেদনের ওপর সরকার ও নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি নির্ভর করে। কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সার্কভুক্ত দেশের দু-একজন পর্যবেক্ষক নির্বাচনে অংশ নিলেও দাতা ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর আস্থা অর্জনে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এবার এরই মধ্যে ইইউ পর্যবেক্ষক পাঠাতে অনীহার কথা জানিয়েছে। এখন তাদের আস্থায় আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ৭০২ কোটি টাকা ব্যয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সব প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে—যা কমিশনকে ইমেজ সংকটে ফেলে দিতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল