সচিবালয়ের দেয়ালে যত পোস্টার

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ১০:০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

সচিবালয়ের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন পোস্টার। সুন্দরবনের নতুন বা পুরনো মধু পেতে চাইলে আপনাকে আসতে হবে সরকারের প্রধান প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়ে। সচিবালয়ের মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাছে পাওয়া যাবে এই মধু। একইসঙ্গে সৌদি আরবের আসল খুরমা খেজুরও আছে তার কাছে। শুধু মধু বা খেজুর নয়, আপনি রাজধানীর যে কোনো এলাকায় নিষ্কণ্টক জমি কিনতে চাইলেও তার সন্ধান পাবেন সচিবালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে। যোগাযোগের জন্য অনেকের নামের সঙ্গে মোবাইল নম্বরও দেওয়া থাকে।

আশেকে রাসুল (সা.) সম্মেলনের পোস্টারও লাগানো হচ্ছে সচিবালয়ের ভেতরের বিভিন্ন দেওয়ালে। একইসঙ্গে অখ্যাত সংবাদপত্র ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের পোস্টারও রয়েছে সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের লিফট বা সিঁড়ির গোড়ায়। জানা গেছে, যারা এসব পোস্টার লাগান তাদের বেশির ভাগই সচিবালয়ের কর্মচারী।

সচিবালয়ের দেয়ালে পোস্টার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সচিবালয়ের মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন মো. আবদুল কাদির। তিনি মূলত গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী পদের কর্মচারী। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জানতে চাইলে আবদুল কাদির জানান, কোনো বেতন-ভাতা বা সুবিধা ছাড়াই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। খেদমত করছেন আল্লাহর বান্দাদের। স্যারেরা সবই জানেন বলে বলেন আবদুল কাদির। অনেকে আসল মধু চায়, খুরমা চায়। তাই এগুলো এনে বিক্রি করেন তিনি। বাইরের কেউ ফোন দিলে তাকে সচিবালয়ের গেটে আসতে বলি। সেখানে গিয়ে মধু বা খুরমা সরবরাহ করি। আর সচিবালয়ের ভেতরের কোনো ক্রেতা হলে সরাসরি মসজিদে এসে নিয়ে যান।’

সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, সচিবালয়ের দেওয়ালে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পোস্টারও শোভা পাচ্ছে। যেমন কৃষি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নমূলক পোস্টার বেশি সাঁটানো হয়েছে সচিবালয়ের চার নম্বর ভবনের তিনটি লিফটের গোড়ায়। কারণ, এ ভবনেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের দফতর। একইভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নমূলক পোস্টার সাঁটানো হয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয় যে ভবনে অবস্থিত সেই ভবনের প্রবেশ মুখে। একইভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রবেশ পথে স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পোস্টার সাঁটানো রয়েছে।

সচিবালয়ের দেয়ালে পোস্টার প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের দেওয়ালে ছিল ক্ষমতাসীন দলের নিচের সারির বিভিন্ন নেতার পোস্টারও। এসব নেতা মূল দলের কেউ না হলেও দলে নাকি তাদের বেশ প্রভাব। আঞ্চলিক ও সহ-সংগঠনের পাতি গোছের এসব নেতার পোস্টারে ব্যবহার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অন্যান্য মন্ত্রীর ছবি। কখনো কোনো অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা বাণিজ্যমন্ত্রীর হাতে ফুল দিয়েছিলেন বা হাত মিলিয়েছেন, সেই মুহূর্তের ছবি বড় করে লেমিনেটিং করে লাগানো হয়েছে সচিবালয়ের দেওয়ালে। ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টরা এগুলো সরানোরও সাহস পাচ্ছিলেন না।

সচিবালয়ের দেয়ালে পোস্টার ‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ আনুযায়ী, বাসস্থান, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, দোকান বা অন্য কোনো স্থাপনার (কাঁচা বা পাকা যাই হোক) বাইরে ও ভেতরের দেয়াল বা সীমানা নির্ধারণকারী দেয়াল বা বেড়ায় এবং গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, খাম্বা, সড়কদ্বীপ, সড়ক বিভাজক, ব্রিজ, কালভার্ট, সড়কের উপরিভাগ ও বাড়ির ছাদেও পোস্টার লাগানো যাবে না।

আইনে বলা হয়, কেউ পোস্টার লাগালে সংশ্লিষ্টদের তুলে ফেলতে হবে। পোস্টার মুছতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে। এক্ষেত্রে ব্যয়ের অর্থ সুবিধাভোগীর কাছ থেকে নগদ আদায় করার বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি আইন লঙ্ঘন করলে অন্যূন পাঁচ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদ- হবে। অনাদায়ে ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- এবং ওই ব্যক্তিকে নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলার আদেশ দেওয়া যাবে বলে আইনে বলা আছে।

আর কোনো সুবিধাভোগীর অধীনে পোস্টার লাগালে সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে অন্যূন ১০ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- করা যাবে। সচিবালয় ইডেন গণপূর্ত বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘কেপিআই স্থাপনায় পোস্টার সাঁটানো অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ।’

সরকারি পোস্টারের বিষয়ে মন্তব্য না করলেও ব্যক্তিগত পোস্টারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পোস্টার তুলে ফেলা হলেও আবার সাঁটানো হয়। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা প্রয়োজন।’ ছুটির দিন প্রতি শুক্র ও শনিবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয় বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। পোস্টার তুলতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মচারী। চাকরির ভয়ে নাম প্রকাশেও আপত্তি জানান তারা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম জানান, সরকারি স্থাপনায় বিশেষ করে সচিবালয়ের দেয়ালে যেকোনো ধরনের পোস্টার লাগানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পিডিএসও/তাজ