নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩১ | আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত এক সভায় এ অনুমোদন দেয় কমিশন। বৈঠকে ২২ দফা প্রস্তাবনা ও ৯৯ কর্মপরিকল্পনার পেছনে নির্বাচনের প্রস্তুতি থেকে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০২ কোটি টাকা।

নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ সংসদ নির্বাচন প্রস্তুতির সভা শেষে বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র, বাজেট, ভোটার তালিকা, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, ইভিএমসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এর আগে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহের পর আরেকটি বৈঠক করে সেখানে ভোটগ্রহণের তারিখসহ তফসিল চূড়ান্ত করা হবে।

সচিব বলেন, এ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সরাসরিসহ অনলাইনের মাধ্যমে জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার যারা হবেন সম্ভাব্য ডিসি, ইউএনও, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এর আগে বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত কমিশন সভা শুরুতে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সভার এজেন্ডার বাইরে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরতে চাইলে এতে আপত্তি তোলেন সিইসিসহ অপর তিন কমিশনার (রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রি. জে. (অব.) শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী)। পরে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কমিশনের সভা বর্জন করেন। এর আগে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ৩০ আগস্ট বর্জন করেছিলেন এই কমিশনার। পরে সাংবাদিকদের কাছে বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করেন ইসির জ্যেষ্ঠ এ নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, শপথ নেয়ার পর সভায় কথা বলতে না দেয়া বাকস্বাধীনতা খর্বের শামিল।

বর্জনের কারণে তিনি সভায় থাকেননি; তবে তাকে ছাড়াই দুই দফা বৈঠকে বসে কমিশন। এজেন্ডাভুক্ত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করে কমিশন সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন দেয়; যার বাস্তবায়ন আজ থেকে শুরু হচ্ছে।

ইসি সচিব জানান, আমরা নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি ইসির কাছে তুলে ধরেছি। আমরা এরই মধ্যে বেশকিছু নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ করেছি। বাকি সামগ্রী অক্টোবরের মধ্যেই সংগ্রহ করা হবে। তিনি জানান, নির্বাচনের ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি ইসির রয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য গত এক মাস আগে আরপিও সংশোধন করে তা সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টিও কমিশন ভেবে দেখবে।

উল্লেখ্য, আগামী ২১ অক্টোবর দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন শুরু হবে। এ অধিবেশনে ইসির সংশোধিত আইনটি পাস হলে ইভিএম এ নির্বাচনে বাস্তবায়ন করবে কমিশন।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে সচিব বলেন, আমরা ভোটার তালিকা করে তা মাঠ প্রশাসনে পাঠিয়ে দিয়েছি। একইসঙ্গে কোনো ধরনের ভুলভ্রান্তি থাকলে তা ৩০ অক্টোবরের মধ্যে কমিশনকে জানাতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তফসিল ঘোষণার আগে এগুলো সংশোধন করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা যায়। তিনি বলেন, নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্র্নিধারণের গেজেট হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১০টির বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা হয়েছে। মামলার গতিপ্রকৃতি জানানোর জন্য আইন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোট কেন্দ্র স্থাপন বিষয়ে হেলালুদ্দীন বলেন, সংসদ নির্বাচনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪০ হাজার ১৯৯টি ভোট কেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের ২৫ দিন আগে তার গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে যে ভোট কেন্দ্র আছে, তার অতিরিক্তি ৫ শতাংশ কেন্দ্র চিহ্নিত করে রাখার কমিশন আজকের (গতকাল) সভায় নির্দেশনা দিয়েছে; যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনোভাবে কেন্দ্র নষ্ট হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ওইসব কেন্দ্রে অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করা যায়।

তিনি বলেন, নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক আমন্ত্রণ জানানো হবে। সার্কভুক্ত নির্বাচন কমিশনারদের সংগঠন ‘ফেমবোসা’ কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এই সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কমিশন আগামী সপ্তাহে বৈঠক করে অনুমোদন দেবে।

প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্বাচনী ফল সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হবে উল্লেখ করে ইসি সচিব বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনের ফল সংগ্রহ করা হবে। এখানে বসে তা ঘোষণা করা হবে। অনলাইনে কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করব যেগুলোর মাধ্যমে দ্রুত ফল পেতে পারি।

নির্বাচন উপলক্ষে শূন্যপদে পদায়ন দেওয়ার কথা জানিয়ে ইসি সচিব বলেন, নির্বাচনের সময় প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী অফিসার পদায়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের পদ যেন খালি না থাকে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কারণে মাঠ প্রশাসনে, বিশেষ করে উপজেলায় আমাদের নির্বাচনী কর্মকর্তার পদ কিছু খালি থাকবে। সেসব ক্ষেত্রে অন্যান্য দফতরের সরকারি কর্মকর্তাকে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেব।

তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেখে এই প্যানেল তৈরি করার জন্য কমিশন বলেছে। আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, আট বিভাগে ৮টি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য রাঙামাটিতে বিশেষ একটি সভা হবে বলেও তিনি। কমিশনের অনুমোদিত প্রস্তুত বাস্তবায়নে কমিশনারদের একজন করে আহ্বায়ক করা হয়েছে।

ইসির বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ মাহবুব তালুদারের

নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা বর্জনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি। মাহবুব তালুকদার বলেন, গত বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন মাস নির্বাচন কমিশন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করে। এতে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুশীল সমাজ, মিডিয়া, পর্যবেক্ষণকারী, নারীনেত্রী প্রমুখ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। এই সংলাপ ছিল একপক্ষীয়। নির্বাচন কমিশন তাদের বক্তব্য শোনা ছাড়া নিজেদের মতামত প্রদান করেনি, সবার সংলাপ সুদৃশ্য গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হলেও সংলাপের সুপারিশ বা প্রস্তাব সম্পর্কে এ পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। সংলাপের কোনো কার্যকারিতা না দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি ওই সংলাপ পর্যালোচনা করে কমিশন সভায় কতিপয় প্রস্তাব পেশ করতে চেয়েছি এবং কমিশনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছি।

তিনি আরো বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশীদারমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাবনা শিরোনামে আমি যা আলোচনা করতে চেয়েছিলাম নির্বাচন কমিশন সভায় তা উপস্থাপনা করতে দেয়া হয়নি।

অথচ বিগত ৮ অক্টোবর কমিশন সচিবালয় থেকে ইউ ও নোটের মাধ্যমে আমাকে আজকের সভায় তা উপস্থাপনার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। আমাকে আমার প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করতে বলে তা না দেয়ায় আমি অপমানিত বোধ করেছি।

বাকপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান প্রদত্ত আমার মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার এই অধিকার খর্ব করতে পারে না। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে হয়ে আমি নির্বাচন কমিশনের এ রকম সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করেছি এবং এর প্রতিবাদ স্বরূপ নির্বাচন কমিশন সভা বর্জন করেছি।

এ কমিশন সভায় উপস্থাপনার জন্য তৈরি প্রস্তাবনাসমূহও তুলে ধরেন সাবেক আমলা এই নির্বাচন কমিশনার। জতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তিনি প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেন, আগের নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম মূল্যায়ন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিভাবে তাদের ব্যবহার করা যায় তা ঠিক করা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে নির্বাচনে অনিয়মের পথ বন্ধ হয়; নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না হলে তা গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশকে সমর্থন করে না; রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশন দ্বিপক্ষ ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারে, নির্বাচনে নিরপেক্ষতা লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ডের ওপর নির্ভর করে; নির্বাচনকালীন সংসদ সদস্যদের নিষ্ক্রিয় রাখা নির্বাচন কমিশনের একার ওপর তা নির্ভর করে না; এতে সরকারের সহযোগিতা দরকার, নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট ক্ষমতা আছে; কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাও আছে; সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতায় কমিশন ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর খুব একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারিনি; ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কীভাবে আরো নিয়ন্ত্রণাধীন করা যায় তা দেখা উচিত এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার নির্বাচন কমিশনের বড় অংশীজন; সংলাপে দেখা যায় কিছু বিষয় রাজনৈতিক বা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ আবশ্যক, যোগ করেন বিএনপির প্রস্তাব থেকে নির্বাচন কমিশনার হওয়া এ কমিশনার।

পিডিএসও/হেলাল