গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

স্বস্তিতে আ.লীগ, সঙ্কটে বিএনপি

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ১২:৫৪

কাইয়ুম আহমেদ

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় প্রকাশের পর স্বস্তিতে আছে সরকার। দলের অস্তিত্ব ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যে চালানো হামলার বিচার হওয়ার পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। একে নৈতিক বিজয় বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারা মনে করে, এই রায়ের ফলে বিএনপি গ্রহণযোগ্যতার সংকটে পড়বে। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, এই ভয়াবহ রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিচার করে অাওয়ামী লীগ তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এতে বিএনপি যে ঐক্য প্রক্রিয়ায় জোট বেঁধে আন্দোলনের কথা চিন্তা করছে তাও বাধাগ্রস্ত হবে।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে গত বুধবার। এতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এই রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর আগে সংঘটিত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিচারিক আদালতে শেষ হলো।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়। এতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী সে সময়ের মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন মারা যান। আহত হন কয়েকশত। রায়ে হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত তারেক রহমানে ফাঁসি না হওয়ায় আওয়ামী লীগ থেকে উষ্মা প্রকাশ করা হয়। 

রায়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গ্রেনেড হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমানের ফাঁসির দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের ফাঁসি দাবি করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে সরকারের কাছে আবেদন করব।’ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও একই মন্তব্য করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারের জন্য তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা হবে।

দুইটি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দলের নেতৃত্বে থাকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিএনপিকে এখন তার বিকল্প ভাবতে হবে বলেও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বিএনপির যারা সজ্জন রয়েছেন তারা দলের নেতৃত্বে একজন খুনি থাকুক কখনোই চাইবেন না।

ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারাও এখন বিএনপিকে নিয়ে আন্দোলনে যেতে দ্বিধায় পড়বেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ২১ আগস্টের খুনের দায়ে দণ্ডিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ড. কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরী কোন নৈতিকতায় ঐক্য প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন?

ওবায়দুল কাদের বলেন, আজকে যারা গণতন্ত্রের ভাষায় কথা বলেন, যারা আইনের শাসনের কথা বলেন, কথায় কথায় নৈতিকতার কথা বলেন, খুনিদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য করবেন—এই জাতীয় ঐক্যে জনগণ কোনো দিনও বিশ্বাস করবে না, সমর্থন করবে না। তিনি আরো বলেন, ‘২১ আগস্টের খুনিরা, মাস্টারমাইন্ড-প্লানার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তারেক রহমান যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সেই দলের সঙ্গে কোন নৈতিকতায় ঐক্য করেন? এই খুনি দলের সঙ্গে ড. কামাল হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী আপনারা তথাকথিত জাতীয় ঐক্য করছেন?’

এদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, যারা আইনের শাসন নেই বলে চিৎকার করেন তাদের দিকে এ রায় প্রশ্ন ছুড়ে দেবে। তবে ২০০৪ সালের ওই দিন ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সমঝোতার শেষ সম্ভাবনাকে চিরতরে হত্যা করেছে, সেই সম্ভাবনার আলো আর নাও ফুটে উঠতে পারে। ক্ষমতাসীন এই দলটির নেতাদের মতে, রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরও পরাজয় ঘটেছে। তাছাড়া এটা আইনের শাসনেরও বিজয়। কিন্তু ওই বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাস্টারমাইন্ড খ্যাত তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি ক্ষমতাসীন এই দলটির নেতাকর্মী এবং আহত ও নিহতের স্বজনরা।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ১৪ বছর পর হলেও রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু আওয়ামী লীগের ওপর এই হামলা হয়নি, এর ফলে একটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে। আর এর বিচার হওয়ায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পরাজয় ঘটেছে। কিন্তু ওই বর্বর হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ায় আমরা আইনের আশ্রয় নেব।

তিন বলেন, ১৪ বছর জাতির ইতিহাস এক ভয়াবহ কলঙ্কের ভার বহন করেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বুকে যা ঘটেছিল তা মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে, বিবেক হয়ে পড়ে যন্ত্রণাদগ্ধ। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের একসঙ্গে খতম করে জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার কী ভয়াবহ উদ্যোগ। নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড জোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং অবশেষে ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগ আর ভারতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। রায়ের মধ্য দিয়ে সেই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খুলে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক মনে বলেন, রায়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলো। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং এই ২১ আগস্টের বিচার—এর কোনোটিই বিশেষ কোনো ট্রাইব্যুনালে করেনি সরকার। প্রচলিত আইন মেনে, যথাযথ প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করে বিচার করেছে। তাই এখানে কোনো ব্যত্যয় হয়েছে সেই প্রশ্ন তোলা অসম্ভব হবে। আর এর ফলে সঙ্গত কারণেই সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২১ আগস্টের হামলাসহ বিভিন্ন সময়ে যে বৈরী আচরণ করা হয়েছে তার মূলে ছিল খালেদা জিয়ার পরিবার। বিএনপির অনেক সহানুভূতিশীল মানুষও ২১ আগস্টের হামলাকে সমর্থন করে না। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে কিন্তু তাকে হত্যা করতে হবে এমন মনোভাব তাদের নেই। কিন্তু দলীয় অবস্থানের কারণে তারা কোনো কিছু বলতে পারেন না। বিএনপিতে যারা এসব বিষয় সমর্থন করে না তাদের এখন কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারেক রহমানের অনুপস্থিতির এই সুযোগ তারা কাজে লাগাতে পারে। তারা অপরাধীমুক্ত একটি দল গঠন করতে পারে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, এই রায়ের আমাদের এক নৈতিক বিজয়। আইনের শাসনেরও বিজয়। যারা আইনের শাসন নেই বলে চিৎকার করেন তাদের দিকে এ রায় প্রশ্ন ছুড়ে দেবে।

তিনি আরো বলেন, বিএনপির ভেতরে যারা সজ্জন ব্যক্তি আছেন তারা নিশ্চয়ই চাইবেন না একজন খুনি তাদের দলীয় প্রধান হিসেবে থাকুক। তাদের দায়িত্ব আছে, দলকে কলঙ্কমুক্ত করা। আর তারা যদি তা না করে তবে তাদের এজন্য মূল্য দিতে হবে। বৈরিতার রাজনীতি বেশি দিন টেকে না—এ বিশ্বাস এখন তাদের করা উচিত।

পিডিএসও/হেলাল