গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ

সবার চোখ আদালতে

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:১৬ | আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ১০:২৯

প্রতীক ইজাজ

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগের সমাবেশের ওপর সংঘটিত নৃশংস ও বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় আজ বুধবার। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায়ের জন্য ১০ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।

এক যুগ আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলা থেকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দলীয় নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে প্রাণে বাঁচালেও গুরুতর আহত হন তিনি। মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আইভি রহমানসহ নিহত হন ২৪ জন। আহত হন আরো কয়েকশ নেতাকর্মী।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার অধিকতর তদন্ত শেষে দুর্নীতির দায়ে কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার ছেলে ও দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হুজি নেতা মুফতি হান্নান, বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৫২ জনকে আসামি করা হয়। পরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াত নেতা আলী আহসান মো. মুজাহিদ ও অন্য মামলায় মুফতি হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯।

আজ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। উৎসুক দেশের মানুষ। আন্তর্জাতিকভাবে এ মামলার রায়কে বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে এ মামলার রায় নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংকটাপন্ন বিএনপি এ মামলার রায়কে কীভাবে নেবে; সেদিকেও তাকিয়ে সবাই। বিশেষ করে ভয়াবহ এ হামলায় নিহতদের স্বজন ও আহতরা উন্মুখ হয়ে আছেন হামলাকারীদের সর্বোচ্চ সাজার আশায়। আদালত বলছেন, এ মামলার বিচারে কোনো ফাঁক রাখার চেষ্টা করা হয়নি। কখনো কারো অধিকারবঞ্চিত করা হয়নি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল এ যাবৎকালের ভয়াবহতম ও বর্বরোচিত রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। ওইদিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো এই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন। হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। মঞ্চে উপবিষ্ট দলের নেতারা মানববর্ম তৈরি করে তাকে প্রাণে বাঁচালেও মারাত্মক আহত হন তিনি। হামলায় মারাত্মক আহত হন প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী; যারা এখনো শরীরে গ্রেনেডের স্প্রিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।


আজ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে


মামলার রায় ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় সরকার। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে রাজধানীতে। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের বিশেষ আদালতে তল্লাশি চলবে। বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। এ ছাড়াও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে পুলিশ সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছে। শহরজুড়ে থাকছে গোয়েন্দা নজরদারি।

এই হামলা ঘিরে নানা তর্কবিতর্ক চলছে রাজনীতিতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এ হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করে আসছে। আর বিএনপি জড়িত নয় বলে জানিয়ে আসছে। গতকালও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড (প্রধান পরিকল্পক) হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি হলফ করে বলতে পারেন এই হামলার সঙ্গে তারেক রহমান জড়িত ছিলেন না। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে অনেক আগেই।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেই এ মামলা হলেও ওই সরকারই বারবার এ মামলায় হস্তক্ষেপ করে। জড়িতদের রক্ষায় মনগড়া তদন্ত সাজানো হয়। এই হামলায় জড়িতদের রক্ষায় নানা অপচেষ্টা চালায় ওই সরকার। অপতৎপরতার অভিযোগ ছিল এ মামলার তৎকালীন তদন্ত সংস্থা সিআইডির বিরুদ্ধে। বিশেষ করে জজ মিয়া নাটক ছিল বহুল আলোচিত। গ্রেনেড হামলার ঘটনাস্থল বা পরিকল্পনার সঙ্গে না থেকেও ক্ষতির শিকার হন জজ মিয়া। সে সময়কার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এ কাজে প্রভাব বিস্তারে।

২০০৮ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গতি পায় এ মামলার। জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান এবং বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে এ মামলার অধিকতর তদন্ত করা হয়। ওই তদন্তে তারেক রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মো. মুজাহিদসহ আরো ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এ মামলার আাসামি করা হয় ৫২ জনকে। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। অন্য মামলায় মুফতি হান্নান, আলী আহসান মো. মুজাহিদসহ তিনজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল শনিবার। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনের রাস্তায় একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বিকেল ৩টায় শুরু হয় সমাবেশ। ঘণ্টাখানেক পরে যোগ দেন দলটির প্রধান ও তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। তিনিই ছিলেন প্রধান অতিথি। কিন্তু তার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে বিকট শব্দ গ্রেনেড বিস্ফোরণ হতে থাকে। বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেন; যাতে তার গায়ে কোনো আঘাত না লাগে। পরে তাকে নিরাপদে গাড়িতে ওঠাতে সমর্থ হন। এই হত্যাচেষ্টার মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে অন্তত ১৯ বার হত্যাচেষ্টার কথা জানা গেছে।

সিআইডির তদন্ত সূত্রমতে, গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী-হুজির জঙ্গিরা। মুফতি হান্নানের নির্দেশনায় ওই আক্রমণে সরাসরি অংশ নেয় প্রশিক্ষিত ১২ জঙ্গি। হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু। পিন্টুর ভাই হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন এ আক্রমণের জন্য আর্জেস গ্রেনেড সরবরাহ করেছেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। ওই হামলাল মূল লক্ষ্য ছিলেন শেখ হাসিনা। তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছিল হামলাকারীরা।

সেদিনের গ্রেনেড হামলার চিহ্ন আর স্প্রিন্টার শরীরে বয়ে বেড়ানো আহত এবং সে হামলার নিহতের পরিবারের স্বজনরা নারকীয় সেই হামলায় জড়িতদের সর্বোচ্চ সাজা আশা করেছেন।

আদালত সূত্র জানায়, মামলার ৪৯ আসামির মধ্যে জামিনে ছিলেন আটজন। পরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর জামিনে থাকা আটজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় ও পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরা হলেনÑ খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, সাবেক তিন আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অব.) রুহুল আমিন, এএসপি (অব.) আবদুর রশিদ ও এএসপি (অব.) মুন্সি আতিকুর রহমান।

আগে থেকেই কারাগারে রয়েছেন ২৩ জন। এরা হলেন—বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইয়ের ঘটনার সময়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তখনকার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম। কারাগারে থাকা অন্য আসামিরা সবাই জঙ্গি সংগঠন হুজির সদস্য বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এরা হলেন—শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর আবু হোমায়রা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সি ওরফে আবুল কালাম ওরফে আবদুল মান্নান, মহিব্বুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মাইন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মাইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, মাওলানা ইয়াহিয়া এবং আবু বকর সিদ্দিক ওরফে সেলিম হাওলাদার।

ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন ১৯ জন। পরে ২০১৪ সালের ৬ নভেম্বর কেরানীগঞ্জ থেকে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা আবু বকর সিদ্দিক ওরফে সেলিম হাওলাদারকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। বাকি ১৮ পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি দীর্ঘদিনেও।

পিডিএসও/হেলাল