বর্জ্য ডাম্পিং নিয়ে বিপাকে ২ সিটি

শুরু হচ্ছে না বিকল্প ব্যবহার

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৪১

হাসান ইমন

ল্যান্ডফিল (আবর্জনা ভূমি) ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্জ্য ডাম্পিং নিয়ে বিপাকে পড়ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তরের আমিন বাজার ল্যান্ডফিল ভরাট হয়েছে, দক্ষিণের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলও ভরাটের পথে। নতুন করে ল্যান্ডফিলের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রাজধানীতে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় নতুন ল্যান্ডফিলও ভরাট হয়ে যাবে কয়েক বছরের মধ্যে। বর্জ্যর বিকল্প ব্যবহার শুরু না করলে ভবিষ্যতে মহাবিপদে পড়বে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। বিশেষজ্ঞরা এ মত দিয়েছেন।

১৯৯১ সালে ঢাকা মেগাসিটিতে জনসংখ্যা ছিল ৬৪ লাখ ৮৭ হাজার। এই জনসংখ্যার জন্য ১৯৯০ সালে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য ৫০ একর জমির ওপর ল্যান্ডফিল তৈরি করে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আরো ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সম্প্রসারণ করা হয়। এ ল্যান্ডফিলের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সাল পর্যন্ত। অপরদিকে, আমিন বাজার ল্যান্ডফিলটি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৫০ একর (১৫৬ বিঘা) জমির ওপর নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে এখানে বর্জ্য ডাম্পিং শুরু হয়। সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ায় উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় পড়েছে এটি। এর মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ২০১৬ সালের মধ্যে ভরাট হওয়ার কথা থাকলেও সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ায় এখনো ভরাট হয়নি। তবে আগামী বছরের মধ্যে ভরাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুনকরে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য আরো ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে সংস্থাটি। এ জায়গাটুকু আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভরাট হয়ে যাবে বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ডিএসসিসি এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। এরসঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে আট ইউনিয়ন তথা ১৮টি ওয়ার্ড। বর্তমান ডিএসসিসির আয়তন ৪৫ বর্গকিলোমিটার। নতুন যুক্ত হচ্ছে ৬৪ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার। এসব এলাকায় প্রায় ২০ লাখ লোক বসবাস করছে। দিন দিন জনসংখ্যা আরো বাড়বে। বর্জ্যর পরিমাণও বাড়বে।

জানা গেছে, নতুন অধিগ্রহণের ৮১ একর জায়গার মধ্যে ৫০ একর ল্যান্ডফিল্ড ও ৩১ একর জায়গা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে মালয়েশিয়া, চীন, কোরিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ইইউসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র সংস্থাটির কাছে প্রস্তাবও পাঠিয়েছে। তবে একনেক অনুমোদন দিলেই আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে ডিজাইনের কাজ ও তা যাচাই-বাছাইয়ের পর এলজিইডি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে দ্রুত আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের কথা গত দুই বছর থেকে শোনা গেলেও কখন শুরু হবে জানেন না কোনো কর্মকর্তা।

এর আগে ২০১২ সালে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই বছরের শেষ দিকে ইতালিয়ান কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট ইন্টার এনভায়রনমেন্ট ফিন্যান্সের (এসআরএল) সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথম দেড় বছরে দুটি প্লান্টে ১০ মেগাওয়াট, দুই বছরে ৩০ মেগাওয়াট ও তিন বছরে ৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। পরে প্রকল্পটি আর অগ্রসর হয়নি। কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত বাতিলের আদেশও হয়নি।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছকু এক কর্মকর্তা বলেন, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ভরাটের শেষের দিকে। নতুন করে সিটি করপোরেশন আরো সম্প্রসারণ হয়েছে। সব মিলিয়ে এ ৮১ একর জায়গা ভরাট হতে সময় লাগবে ৪-৫ বছর। এরপর সিটি করপোরেশন কি করবে? এখনো যদি বর্জ্য পরিশোধন না করে তাহলে ভবিষ্যতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মহাবিপদে পড়বে।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হয়ে আসলে কাজ শুরু হবে।

অন্যদিকে, ডিএনসিসিতে প্রতিদিন তিন হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য উৎপাদন হয়। এ ময়লা ফেলার জন্য ডিএনসিসির নির্দিষ্ট রয়েছে আমিন বাজার ল্যান্ডফিল্ড। এই ল্যান্ডফিলটি ২০০৬ সালে করা হলেও মেয়াদ ছিল ২০১৭ সাল পর্যন্ত। মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে বর্ধিত করা হয়নি। ফলে এ ল্যান্ডফিল্ডটি ভরাট হয়ে আশপাশের আরো ২০ একর জমি ভরাট হয়ে গেছে। ডিএনসিসি প্রভাবশালী সরকারি সংস্থা হওয়ায় এলাকাবাসীর প্রতিবাদও তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে না।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমিন বাজার ল্যান্ডফিল্ডটি ভরাট হয়ে গেছে। এর পাশে নতুন করে আরো ৮১ একর জমি অগ্রিহণের জন্য জিওবি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে। আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া নাসিরাবাদে বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করার জন্য ১০০ একর জায়গা অধিগ্রহণের জন্য জিওবি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কবে শুরু হবে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, কখন হবে এটা বলা যাবে না। তবে এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়।

এই বিষয় নিয়ে নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য দুই সিটি করপোরেশন নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই জমিগুলো ভরাট হয়ে যাবে। এ সমস্যাগুলো দূর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর পরিণতি বরণ করতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ দূষণের পাশাপাশি ল্যান্ডফিলের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ নষ্ট হবে। এতে করে ল্যান্ডফিলগুলোকে পরিত্যক্ত বর্জ্য ভাগাড় ঘোষণা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে জাপানের মতো ল্যান্ডফিলের বহুমুখী ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হবে। এর জন্য সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলেও এখনো শুরু হয়নি কোনো কার্যক্রম। কখন শুরু হবে জানেন না কেউই। যদি দ্রুত এ ধরনের কোনো প্রকল্প হাতে না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বর্জ্য ডাম্পিং এ ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

এই নগর বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার করে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এ জন্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস তৈরির কথা বলা হচ্ছে। সেসব না হলেও এসব বর্জ্যকে ভস্মীকরণ করে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার না করে বিদ্যমান জমিতেই আবর্জনা ব্যবস্থাপনার সমাধান বের করতে হবে। এটা করা সম্ভব হলে দুই সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় টেকসই রূপ পাবে। আর সেটা না করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খাবে।

পিডিএসও/হেলাল