ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে অনীহা পথচারীদের ‘খোঁড়া যুক্তি’

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৫৮ | আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৪৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানামুখী কার্যক্রম চালাচ্ছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন চলছে। মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হেলমেট না পরলে পাম্প থেকে তেলও দেওয়া হচ্ছে না। ইতোমধ্যে প্রধান প্রধান সড়কে লেগুনা চলাচাল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিকল্প যানবাহন না থাকায় বিপাকে পড়ছেন নগরবাসী।

এদিকে, রাস্তা পারাপারে মানুষকে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করাতে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের। চালক, যাত্রী ও পথচারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে রাজধানীতে ছুটির দিনেও তৎপর ট্রাফিক পুলিশ। তাদের সঙ্গে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বিএনসিসিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও জনসাধারণকে সচেতন করতে রাজপথে নেমেছেন। মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কর্মসূচিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশাবাদী ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগ।

শুক্রবার বেলা ১১টায় বাংলামোটর মোড়। পথচারীদের ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার করাতে যেন লড়াইয়ে নেমেছেন রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা। তাদের সঙ্গে তর্ক-যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়েন অনেক পথচারী। ট্রাফিক পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের বাধা উপেক্ষ করেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন পথচারীরা।

একজন নারী পথচারী বলেন, আজকে যে এই নিয়ম করছে, এটা তো আমি জানি না। অন্য সময় তো যাই। আর একজন পথচারী নিজেকে বৃদ্ধ দাবি করে বলেন, বুড়া মানুষ কেমনে যাব? এর লাইগা দৌড়াইয়া আইয়া পড়ছিলাম। আমার তো ৬০ চলতাছে। দাঁতও পইড়া গেছে। সক্ষমতা থাকার পরও জেনে বুঝে নানা ‘খোঁড়া যুক্তি’ দিয়ে পার পেতে চাইছেন পথচারীরা।

হাত ফসকে বের হয়ে যেতে চাইলেও ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যরা। হতাশা থাকলেও জনসাধারণকে জেব্রা ক্রসিং, ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে পেরে আনন্দিত তারা। রাস্তায় মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরার সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপক হারে। এরপরও যারা না পরেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন তাদের মধ্যেও ছিল অনুশোচনা বা নিয়ম মানার আশ্বাস।

এদিকে, বল প্রয়োগে নাগরিকদের ট্রাফিক আইন মানানোয় কতদিনে সফলতা আসবে তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর-জুড়ে ট্রাফিক সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কোনোভাবেই প্রধান সড়কে লেগুনা চলতে দেওয়া হবে না। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে চলছে লেগুনা। তবে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গ্রিনরোড, নিউমার্কেট ও বাড্ডা এলাকায় লেগুনার বিকল্প যানবাহন না থাকায় ক্ষোভ জানান সেখানকার নিয়মিত যাত্রী সাধারণ। তবে যেসব লেগুনা চলছে সেখানে এখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের লেগুনা চালাতে দেখা যাচ্ছে। এখনই এসবের নজরদারি না করলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম-কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাসব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মোড়ে মোড়ে অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর করা হবে। আমরা রাজধানীর বেশ কিছু জায়গায় ইতোমধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল প্রতিষ্ঠিত করেছি। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখব। ট্রাফিকের চারটি বিভাগের ১৫০টি চেকপোস্টে একযোগে পরিচালিত হচ্ছে অভিযান।

অব্যবহৃত ফুট ওভারব্রিজগুলো স্থানান্তরের উদ্যোগ : সঠিক নিয়ম না মেনে রাজধানীর অপ্রয়োজনীয় স্থানে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ফুট ওভারব্রিজগুলো স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি বলছে, যেসব ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করা হচ্ছে না কিংবা নির্ধারিত স্থান থেকে অপেক্ষাকৃত দূরে, সেসব ফুট ওভারব্রিজ স্থানান্তর করে সঠিক স্থানে পুনর্নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে, ব্যবহার হওয়া ফুট ওভারব্রিজগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করা হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ কাজ শুরু করা হবে। বিষয়টি নিয়ে সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এতে কী পরিমাণ ব্যয় হবে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ এই ফুট ওভারব্রিজগুলো নির্মাণ করতে সিটি করপোরেশনের ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে যেসব ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে সেগুলো সঠিক নিয়মে নির্মিত হয়নি। এর অধিকাংশই নির্মাণ হয়েছে ভুল জায়গায়। ফুট ওভারব্রিজগুলোর উচ্চতা অনেক বেশি। বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে এগুলো ব্যবহার করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এ কারণে ফুট ওভারব্রিজ রেখে যানবাহনের মধ্য দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পথচারীরা রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। যার ফলে বাড়ছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে রাজধানীতে ৮৭টি ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ৩২টি ও ঢাকা উত্তরে ৪৯টি। ডিএনসিসিতে আরো দুটি নির্মাণাধীন এবং নির্মাণের পরিকল্পনায় আছে আরো তিনটি ফুট ওভারব্রিজ। এ ছাড়া সংস্থাটির আওতায় রোড অ্যান্ড হাইওয়ের ৫টি এবং রাজউকের একটি ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণের একটি ও উত্তরের দুটি আন্ডারপাস রয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল