কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল

১৮ বছরেও চালু হয়নি আন্তবিভাগ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:১৪ | আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:৪৭

পাঠান সোহাগ

১৮ বছরেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল। নানা জটিলতার কারণে হাসপাতালের আন্তবিভাগও চালু হয়নি। বর্তমানে ত্রিমুখী ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালটি চলছে। এতে উত্তরাবাসী আধুনিক মানের একটি হাসপাতাল পেয়েও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, উত্তরা এলাকায় সরকারি ভালো মানের হাসপাতাল না থাকায় ঢাকা মেডিকেলসহ আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময়, শ্রম, টাকাসহ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। সরেজমিনে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ঈশা খাঁ রোডে গিয়ে দেখা যায়, তিন একর জায়গাজুড়ে বিশাল অবকাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি। ছোট পরিসরে জরুরি বিভাগ আর বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আবার বেলা ২টার আগেই সব কার্যক্রম বন্ধ হতে থাকে। ভবনের নিচতলা, দ্বিতীয়তলার কয়েকটি কক্ষে সব কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি আছে আলট্রাসনোগ্রাফি, এক্স-রে, ইসিজি, ইকো ও রক্তের কয়েকটি টেস্টের ব্যবস্থা। অল্প টাকায় এসব টেস্ট করানো হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য এমআরআই ও সিটিস্ক্যান মেশিন নেই। এ ছাড়া বিশাল ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত প্রতিটি কক্ষে আন্তবিভাগের রোগীদের ব্যবহার উপযোগী সব ধরনের নতুন উপকরণ। ম্যাট্রেস, শয্যা ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী না থাকায় মাদকসেবীরা নষ্ট করছে হাসপাতালের অব্যবহৃত কক্ষের আসবাবপত্র।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৫ বছরের নানা চড়াই-উরাই পেরিয়েই হাসপাতালের বর্তমান অবস্থায় এসেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, চানখাঁরপুলের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় সর্বশেষ ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসে সব কর্মকতা-কর্মচারীকে এ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানে প্রথম ছয় মাস বিদুৎ ও পানি ছিল না। বর্তমানে গ্যাস সংযোগ নেই। জানা যায়, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, চানখাঁরপুলের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ত্রিমুখী ব্যবস্থাপনায় এ হাসপাতালটি চলছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আফজাল হোসেন তালুকদার বলেন, হাসপাতালে যন্ত্রাংশ আছে। আরো কিছু কেনার প্রক্রিয়া চলছে। পর্যায়ক্রমে সবকিছুই কেনা হবে। ২২ জন চিকিৎসক এবং অল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে চলছে হাসপাতালটি। এখানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এই হাসপাতালের কোনো অর্গানোগ্রাম নেই।

তিনি আরো বলেন, এ হাসপাতালের জন্য আলাদা করে কোনো বাজেট হয় না। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালকের মাধ্যমে কেনাকাটা হয়। হাসপাতালে সেবা সম্পর্কে স্থায়ী বাসিন্দারা বলেন, ‘এমন একটি হাসপাতাল থাকতেও আমরা সেবা পাই না। এখানে সাধারণত অপারেশন হয় না। যদি ভালো চিকৎসা হতো, তাহলে আমাদের প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হতো না।’

আনোয়ারুল হক নামে একজন বলেন, ছোট ছেলের চিকিৎসা করাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাই। এই হাসপাতালে যদি আন্তবিভাগ চালু থাকত, তাহলে ঢাকায় যেতে হতো না।

এই হাসপাতালের চিকিৎসা সম্পর্কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল মো. ছগির মিয়া বলেন, ‘২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু হবে। ভবনটির পঞ্চম তলা পর্যন্ত ব্যবহার করা হবে। আইসিইউ, লিফট, জেনারেটর সবই কেনা হয়েছে। এগুলো সংযোজন হবে। শুধু ঘাটতি আছে জনবল।’

জানা যায়, রাজধানীর উত্তরায় তিন একর জমির ওপর কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটির অর্থায়নে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালের ১০ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ হাসপাতাল উদ্বোধন করেন। ওই বছর অক্টোবরে সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর ২০০২ সালে আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি হাসপাতালটি থেকে তাদের সহায়তা তুলে নেয়। পরে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে দুজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ করে সীমিত পরিসরে এটি চালু রাখা হয়। ২০০২ সালের মাঝামাঝি অলাভজনক মনে করে সরকার হাসপাতালটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। হাসপাতালটিকে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর হাসপাতাল ভবনটিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাধ্যমে আমেরিকান হসপিটাল কনসোর্টিয়ামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালে উন্নীত করার কথা থাকলেও কার্যত তা হয়নি। আমেরিকান হসপিটাল কনসোর্টিয়ামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। ২০১২ সালের ৮ মার্চের পর হাসপাতালটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার প্রস্তুতি মুহূর্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদালতের শরণাপন্ন হলে লিজ চুক্তি বাতিলের বিষয়টি ঝুলে যায়। এভাবে এত দিন বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন ছিল। অবশেষে সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত। পরে হাসপাতালটি নতুন করে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, শিগগরিই আন্তবিভাগ সেবা চালু হবে। যন্ত্রপাতি কেনাকাটা হয়েছে। তবে জনবলের ঘাটতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হচ্ছে না। ২৫০ শয্যার কাঠামো অনুয়ায়ী অর্গানোগ্রাম তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলেই কার্যক্রম চালু হবে।

পিডিএসও/হেলাল