হঠাৎ লেগুনা বন্ধ : বিপাকে যাত্রীরা

বিশেষজ্ঞদের মতে বিকল্প ঠিক করে পরে ব্যবস্থা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:২৫ | আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:৩৭

হাসান ইমন
ama ami

রাজধানীর যেসব সড়কে যাত্রীবাহী বাস নেই বা থাকলেও অপ্রতুল, সেসব এলাকায় চলাচলের অন্যতম বাহন হিউম্যান হলার বা লেগুনা। গণপরিবহনের সংকট থাকায় সাধারণ যাত্রীদের কাছেও জনপ্রিয় এ বাহনটি। ঝুঁকি সত্ত্বেও দ্রুত গন্তব্যে যেতে এ বাহনটিতে সওয়ার হন নগরীর মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরা। হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে লেগুনা বন্ধ করে দেওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ যাত্রীরা। এতে ব্যাপক ক্ষোভও দেখা গেছে তাদের মধ্যে।

রুট পারমিট না থাকার কারণ দেখিয়ে গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই রাজধানীতে লেগুনা বন্ধের ঘোষণা দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তার এমন ঘোষণার পর সেদিন থেকেই নগরী প্রায় লেগুনাশূন্য হয়ে পড়ে। গতকাল সকাল থেকে ঢাকার অল্পকিছু রুট ছাড়া বেশির ভাগ রুটের লেগুনাস্ট্যান্ডে গিয়ে কোনো লেগুনা দেখা যায়নি। এর ফলে ওইসব সড়কে ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। সড়কগুলোতে বিকল্প কোনো যান না থাকায় এ দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। নিরুপায় সাধারণ মানুষকে কাভার্ড ভ্যান, ভ্যান ও রিকশায় চলাচল করতে দেখা গেছে। সুযোগ পেয়ে এসব যান চালকরাও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, লেগুনা বন্ধের আগে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দরকার ছিল। এখন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিউট অব প্ল্যানার (বিআইপি)-এর সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহনের ২৫১টি রুটের ১৫৯টিতেই লেগুনা চলছে। এখন হঠাৎ বন্ধ করে দিলে যাত্রীরা কীভাবে যাতায়াত করবে? এ জন্য আগে দরকার ছিল বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করা।

এই পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, পুলিশ যদি যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণ দেখিয়ে লেগুনা বন্ধ করে, তাহলে আগে বন্ধ করতে হবে প্রাইভেটকার । হঠাৎই লেগুনা বন্ধ না করে সড়কে ফিটনেস সনদ যাচাই করতে পারেন। অথবা সড়কে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লেগুনা বন্ধ করতে পারেন। হঠাৎ বন্ধের আগে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বিবেচনার দরকার ছিল। এখন সাধারণ যাত্রীরদের যাতায়াতে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে লেগুনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে তার আগে জনগণের স্বার্থে বিকল্প যানের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে অন্যান্য সড়কে লেগুনা চলাচল নিষিদ্ধ করা যাবে না। তা করা হলে সেটা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর থেকে ত্রুটিযুক্ত বাস এবং লাইসেন্সহীন চালকের বিরুদ্ধে বেশ কঠোর অবস্থানে পুলিশ। এ কারণে এমনিতেই নগরীতে বাসের সংকট। যাত্রীরাও বিপাকে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার থেকে হঠাৎ নগরীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী লেগুনা বা হিউম্যান হলার বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষ এখন দিশেহারা। গতকাল শহরজুড়ে লেগুনা চলে এমন সড়কে মানুষকে খুব কষ্ট করে চলাচল করতে দেখা গেছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে গণপরিবহন এমনিতেই অপর্যাপ্ত। তারওপর বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলাচলে ভোগান্তি বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিএরটির হিসাব অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে অনুমোদিত লেগুনার সংখ্যা ২ হাজার ৫২৫টি। যদিও বাস্তবে সে সংখ্যা আরো বেশি। একেকটি ট্রিপে প্রতিটি লেগুনা ১২ জন যাত্রী বহন করে। এ হিসাবে বিপুলসংখ্যক যাত্রীই চলাচল করে এসব যানবাহনে।

সরজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীতে বেশি লেগুনা চলে এমন রুটগুলোর মধ্যে আছে নিউমার্কেট থেকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন গন্তব্য, নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর, মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালী, মিরপুর থেকে মহাখালী, গুলিস্তান থেকে মুগদা, বাসাবো, খিলগাঁও, রামপুরা থেকে গুলিস্তান প্রভৃতি। পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনের পরেই সবগুলো রুটেই ট্রাফিক পুলিশের সক্রিয় অবস্থানে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে লেগুনা চলাচল। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সড়কের ঢাকা উদ্যানে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। ফলে এই রুটে লেগুনায় চলাচলকারী যাত্রীরা স্বল্প দূরত্বে হেঁটে, রিকশায় বা পণ্যবাহী পিকআপ ভ্যানে করে যাচ্ছেন। এতে খরচ হচ্ছে বেশি।

তবে অনুমোদনহীন বলে লেগুনা বন্ধ করে দিলেও পণ্য পরিবহনের পিকআপ ভ্যানে যাত্রী বহনে বাধা দিচ্ছে না পুলিশ। যদিও এতে ভাড়া, ভোগান্তি এবং ঝুঁকি দুটোই বেড়েছে। বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড় থেকে ঢাকা উদ্যান পর্যন্ত ভ্যান গাড়িতে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। বন্ধ হয়ে যাওয়া লেগুনা এবং ইজিবাইকে এই ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা।

একইভাবে লেগুনায় ১০ টাকার ভাড়া পিকআপ ভ্যানে ২০ টাকা গুনতে হচ্ছে গাবতলীমুখী যাত্রীদের। শিক্ষার্থী সুলতানা আক্তার বলেন, ‘বাসে-লেগুনায় যাওয়া-আসা করি। আজ বাস খুবই কম, লেগুনা তো নেই-ই। সকালে আসার সময়ও পিকআপে এসেছি, যাচ্ছিও পিকআপে।’

ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজের ছাত্র সাকিব বলেন, ‘কার লাইসেন্স নেই, কার গাড়ির কাগজ নেই—সেগুলো আমাদের দেখার কথা না। গাড়ির সমস্যা থাকলে মামলা দেবে। জরিমানার পরিমাণ বাড়াক। সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলার দরকার কী? আমরা গাড়ি পাচ্ছি না। তুলনামূলক কষ্ট করে যাচ্ছি আবার ভাড়াও ডবল।’

যাত্রীরা বলছেন, অবৈধ এবং অনিরাপদ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতেই হবে। কিন্তু আগে বিকল্প ঠিক করে তা করতে হবে। নইলে ভোগান্তি কমবে না। তবে যাদের টাকা-পয়সার সমস্যা নেই তারা ঝামেলায় না গিয়ে অ্যাপভিত্তিক রাইডসেবা ‘পাঠাও’-‘উবারের’ মোটরসাইকেল বা গাড়ি ভাড়া করে যাচ্ছে।

সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, রাজধানীর সাতরাস্তা থেকে বাড্ডা রুটের কোনো লেগুলা দেখা যায়নি। এই রুটের লেগুনাগুলো প্রতিদিন মগবাজার চৌরাস্তা থেকে ইউটার্ন নিয়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে একটি অস্থায়ী স্ট্যান্ড তৈরি করে যাত্রী তুলত। তবে গতকাল সকাল থেকে সেখানে কোনো লেগুনা দেখা যায়নি। যাত্রাবাড়ী এলাকায় চিটাগং রোড থেকে নিউমার্কেট রু?টে কোনো লেগুনা চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া মিরপুর থেকে মহাখালী রুটে কোনো লেগুনা চলাচল করতে দেখা যায়নি। মোহাম্মদপুর থেকে বাড্ডা, ফার্মগেট ও শিয়া মসজিদ থেকে বাড্ডা রুটে কোনো লেগুনা চলাচল করছে না। এ ছাড়াও জিগাতলা থেকে মিরপুর-১ নম্বর রুটেও ছিল না কোনো লেগুনা।

এদিকে ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চেক করার জন্য রাজধানীতে চলছে ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ মোবাইল কোর্ট। এতে রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যায়। এ ছাড়া যেসব গাড়ি চলছে তাও গেটলক করে চলে যাচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে গাড়ির জন্য যাত্রীদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ লেগুনা বন্ধ কেন—জানতে চাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, এনফোর্সমেন্টের মূল কাজটিই পুলিশের। তারা যদি লেগুনা বন্ধ করতে চায়, করুক। গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নিতেই পারে।

কিন্তু বিআরটিএর এই কর্মকর্তার মত মেনে নিতে পারছেন বাংলাদেশ হালকা যান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক বলেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে লেগুনা চলতে দেওয়া হচ্ছে না। এখন যদি বলা হয় ঢাকাতেও লেগুনা চলবে না, তাহলে তা মানার সুযোগ নেই। ৫ হাজার লেগুনার সঙ্গে ২৫ হাজার মানুষের পরিবার আছে কেবল ঢাকাতেই। এর বাইরে আছে আরো ১৫ হাজার লেগুনা। সেখানে আরো ৭৫ হাজার মিলে এক লাখ মানুষের পরিবারের কী হবে, তা-ও দেখা দরকার।

গত মঙ্গলবার ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণ লেগুনা। তাই এখন থেকে শহরের কোথাও এই গাড়িগুলো চলতে দেওয়া হবে না। এতদিন যেসব লেগুনা চলছে, তার কোনো রুট পারমিট নেই। সব অবৈধভাবে চলছে। কারো কোনো অনুমতি নেই।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমাদের নির্দেশনায় যেটা আছে সেটা হলো রাজধানীর প্রধান সড়কের যেখানে বাস চলাচল করে সেখানে লেগুনা চলাচল করতে দেওয়া হবে না। তাদের আমরা অন্যান্য রোডে ঢুকিয়ে দেব। আর অবৈধ যেসব লেগুনা আছে, সেগুলো রাস্তায় চলবে না।’

জানা গেছে, রাজধানীর ১৫৯টি রুটে চলাচল করছে লেগুনা। চার হাজার ২১৯টি গাড়ির অনুমোদনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৭৮টির রুট পারমিট দিয়েছে মেট্রো আরটিসি (রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি)। এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস দিচ্ছে বিআরটিএ। কোন রুটে গাড়িগুলো চলবে তারও অনুমোদন নিতে হচ্ছে। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়নি সরকার। এর আগে ২০১৫ সালে মিনিবাসের আদলে এগুলোর ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে নির্দেশনা দিলেও মাঝপথে থেমে যায় ওই প্রক্রিয়া। অথচ মোটরযান আইনের ধারা ৫২-এর উপধারা ১-এ বলা আছে, ‘বাংলাদেশের সর্বত্র বা যেকোনো অঞ্চলে বা যেকোনো রুটে স্টেজ ক্যারেজ (বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলার)-এর ভাড়া নির্ধারণ করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল