আরপিও সংশোধনে সুপারিশ ভেটিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৩০ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৫

গাজী শাহনেওয়াজ
ama ami

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ সংশোধনে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুপারিশগুলো কেমন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুপারিশ প্রণেতারা বলেছেন, এগুলো আইনে রূপান্তর করা গেলে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথকে মসৃণ করবে। অন্যদিকে ঠিক উল্টো কথা বলেছেন এর বিরোধিতাকারীরা। তারা অভিযোগ করেছেন, এর ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই সুপারিশ সম্পর্কে পাওয়া গেছে নানা তথ্য।

ইসির যুগ্ম সচিব (আইন) মো. সেলিম মিয়া গতকাল সোমবার কমিশন সভায় অনুমোদিত সংশোধিত আরপিওর প্রস্তাবনাটি সচিবালয়ে পৌঁছে দেন। এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া গত ৩০ আগস্ট অনুমোদন পায়। সংশোধিত আরপিওর প্রস্তাবে কম-বেশি ১০টি সুপারিশ রাখা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান এবং আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) যুক্ত হয়েছে। এর আগে আরপিও সংশোধন সংক্রান্ত আইন সংস্কার কমিটি ৩৫টি সংশোধনের প্রস্তাব সুপারিশ করে, যেখানে নির্বাচনে ইসির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখতে আগে-পিছে কিছু না ভেবে যে উদ্দেশ্যে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল খান মো. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন এ নিয়ে রীতিমতো কমিশনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সংশয় বেড়েছে। এটি আরো নিরুৎসাহিত পর্যায়ে নিয়ে গেছে গত রোববার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইভিএম ব্যবহার নিয়ে করা মন্তব্যে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাড়াহুড়া করে ইভিএম চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের পর কমিশনের মুখপাত্র অনেকটা আফসোস করে বলেন, ইভিএম নিয়ে গণমাধ্যমের এত নেতিবাচক খবর ইসির সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা—সে চিন্তা আরো পরে হবে। আইন প্রণয়ন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও সব মহলে এর গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ওপর নির্ভর করবে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা। সরকার যদি আইন করে কিছু আসনে ইভিএম ব্যবহারের চেষ্টা করা হবে, যোগ করেন সিইসি।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ইভিএম আরপিওর সংজ্ঞায় যুক্ত করাসহ প্রায় একডজন সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে ইসি। নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী ও নির্বাচনে কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতার জন্য আরপিওতে বিধিবিধান সংযোজন-বিয়োজনের যে উদ্যোগ নিয়েছিল সাংবিধানিক সংস্থাটি—তা চূড়ান্ত প্রস্তাবে যুক্ত হয়নি।

কিন্তু আরপিওর যে সংশোধনী আনার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এর মধ্যে ইভিএম আরপিওতে যুক্ত করা; যাতে সংসদ নির্বাচনে এটা ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হয়। বর্তমানে এটি স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন স্তরে ব্যবহার হচ্ছে। অনলাইনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিধান করা হয়েছে সংশোধিত আরপিওর খসড়া প্রস্তাবনায়। আগে প্রার্থী নিজে উপস্থিতি হয়ে কিংবা প্রতিনিধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া লাগত। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের ক্ষমতা থাকলেও এবার এর সঙ্গে বদলির ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। আর ঋণখেলাপিদের মনোনয়নপত্র জমার আগ পর্যন্ত ঋণ পুনঃতফসিলের বিধান রাখা। আগে তফসিল ঘোষণার আগে ঋণ পুনঃতফসিলের বিধান ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে টিআইএন সনদ যুক্ত করার বিধানে এবার জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য এটা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলে যাচাইয়ে একজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হলে যাচাইয়ের সময় তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হতো। নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে যাচাইয়ের পরিবর্তে প্রার্থী প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী হিসেবে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা যাবে। নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে নির্বাচনের আপিল ট্রাইব্যুনালে মোকদ্দমা করতে ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হতো, নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র অফেরতযোগ্য করা হয়েছে; ফি ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, ভেটিংয়ে মন্ত্রণালয় ইসির প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ না করলে আসন্ন ৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এ অধিবেশনে আইনটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আরপিও সংশোধনে আইন সংস্কার কমিটির করা সুপারিশ সংশোধন না করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। আইন সংস্কার কমিটির সমন্বয়ক নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম ও কমিশন সচিব মো. হেলালুদ্দীন সাংবাদিকদের জানান। কিন্তু গত মাসের শেষ সপ্তাহে ইভিএম জাতীয় সংসদে ব্যবহারের জন্য হঠাৎ আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেয় ইসি। এ সময়ে আরপিও সংশোধনের উপযুক্ত সময় নয়, এ অভিযোগ তুলেন পাঁচ সদস্যের কমিশনের নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে কমিশনের সভাও বর্জন করেন। তার বর্জনের আরেকটি কারণ ছিল সংশোধিত আরপিও নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না।

এদিকে, আরপিও সংশোধনে ইসির যে আলোচিত ৩৫ সুপারিশ ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল আরপিওর ৯১ এ(১) ধারায় সংশোধনী। এ ধারাতে বলা ছিল নির্বাচনে বিচারিক কর্মকর্তাদের অবাধ ক্ষমতা প্রদান। সেখানে নির্বাচনী অপরাধের জন্য সামারি ট্রায়াল করে শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ইসির। এমনকি অপরাধের শাস্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনকে সুপারিশ করতে পারবে এবং প্যানেল কোডে যেভাবে অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে তার আলোকে সাজা দেবেন এ কর্মকর্তারা। সংশোধিত আরপিওতে এ বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হলে মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হতো; এ ঘটনায় অনেক ব্যক্তি প্রার্থী হওয়াতে বঞ্চিত হতেন। রাজনৈতিক দলবহির্ভূত এসব প্রার্থীদের শর্ত শিথিল করে ১ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিয়ে প্রার্থী হতে পারবেন; এ বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল আইন সংস্কার কমিটি, এটিও সংশোধিত আরপিওতে রাখা হয়নি।

এছাড়া কমিটির অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে নির্বাচনে অবৈধ টাকার প্রভাব ও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়সীমা নির্দিষ্ট রাখতে ব্যয় মনিটরিং কমিটি ও অডিটের নিমিত্তে আলাদা কমিটি গঠন, নির্বাচনে অভিযোগ দাখিল ও তা দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এ বিধান সংযোজন, নির্বাচনে কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাজা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৩ বছর করার বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, নির্বাচনী অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে অভিযোগকারীকে জানিয়ে দেয়া এসব বিধানও রাখা হয়নি এ প্রস্তাবে।

পিডিএসও/হেলাল