নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারো নেই

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:১১

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন ঠেকানোর মতো শক্তি কারো নেই। ষড়যন্ত্র আছে, ষড়যন্ত্র থাকবে, জনগণ সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করবে। কারো হুমকিতে ঘরে বসে থাকলে চলবে না, কাজ করতে হবে। যতক্ষণ সাহস আছে ততক্ষণ মানুষের জন্য কাজ করে যাব। বিমসটেক সম্মেলনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার পর গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাড়াহুড়া করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। কারণ প্র্যাকটিসের একটা ব্যাপার আছে। গত শুক্রবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সাত দেশের জোট বিমসটেকের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন থেকে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। রোববার বিকেল ৪টায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। শুরুতে বিমসটেক সম্মেলন নিয়ে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লিখিত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বিমসটেক সম্মেলনের নানাদিক তুলে ধরে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন এবং এর অব্যবহিত পূর্বে সংশ্লিষ্ট অন্য সভা বাংলাদেশের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের কাঠমান্ডুতে চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে আমার অংশগ্রহণ এবং শীর্ষ সম্মেলনের পূর্বের সভাসমূহে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক অঞ্চলের দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত, সন্ত্রাসসহ অন্যান্য সমস্যাকে যৌথভাবে মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়েছি। সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহায়তা, পুঁজি বিনিয়োগের ওপরও জোর দিই এবং এ সব প্রক্রিয়া জোরদারে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও দলিল দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দিই।

বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর বিদ্যুৎ গ্রিডের মধ্যে আন্তসংযোগ চালুর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে বিমসটেক অঞ্চলে বিদ্যুৎ চলাচলের ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করি।

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইলেকশনটাকে স্বচ্ছ করার জন্য যা যা করার প্রয়োজন সবই কিন্তু আমরাই করেছি। কারণ মানুষের ভোটের অধিকারটা মানুষের হাতেই থাকুক। কাজ করেছি মানুষের জন্য, ভোট দিলে দিল না দিলে নেই, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। এটার কারণ আছে সেটা পরে বলব। ইভিএম ডিজিটাল বাংলাদেশেরই একটা পার্ট। আমরা এখন টাকা পাঠাচ্ছি অনলাইনে, গাড়ি কিনছি অনলাইনে, সবজি কিনছি অনলাইনে। এটা ঠিক যে প্রযুক্তি আমাদের সবসময়ই সুবিধা করে দেয় তা কিন্তু নয়।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকে ইভিএমের বিরুদ্ধে বিএনপি সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। ভোটের রাজনীতিতে কারচুপি করা এটা তো স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল জিয়াউর রহমান। বিএনপি যখন ভোটের কারচুপি নিয়ে কথা বলে তখন তাদের তো জন্মলগ্নটা দেখা দরকার। কোন জন্মের মধ্য দিয়ে তারা এসেছিল? ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের কথা সবার মনে আছে। যাদের জন্মটাই কারচুপির মধ্য দিয়ে তারা আবার কারচুপি নিয়ে কথা বলে। তিনি বলেন, ইভিএম নিয়ে তারা অভিযোগ করবেই, কারণ কারচুপির একটা টেকনিক তাদের জানা আছে। বহু টেকনিক তারা ইলেকশন কারচুপিতে জানে। ইভিএম চালু হলে ব্যালট পেপার একটার বদলে দুটো নিতে পারবে না। সে জন্য তারা আপত্তি জানাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই ভোটের রাজনীতিতে কারচুপি নিয়ে এসেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ইভিএম চালু হলে বিএনপি ভোট কারচুপি করতে পারবে না বলেই তারা আপত্তি জানাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন মামলা দিয়েছিল। আমার একটা মামলাও কিন্তু তোলে নাই। সবগুলো তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে হবে বলে আমি বলেছিলাম। সেগুলো প্রমাণ করতে পারে নাই।

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপ বা যোগাযোগ করার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি ডাক দিচ্ছে, হুংকার দিচ্ছে ভালো। আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। তাতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতারা সরকারকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে এলেও তেমন সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা যে অপমান করেছে, তারপর তাদের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। আপনারা যে যা-ই বলুন, আমি অন্তত বসব না।

বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়াকে তো আমি গ্রেফতার করিনি। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন এতিমের টাকা চুরি করে। তাদের আমলে দুর্নীতি, ঘুষ নেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। তিনি (খালেদা জিয়া) যদি মুক্তি চান কোর্টের মাধ্যমে আসতে হবে। দ্রুত চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মামলা আমাদের সরকারের দেওয়া নয়। ওনাদেরই পছন্দের ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন সাহেবের আমলে দেওয়া।

বিগত জাতীয় নির্বাচন ঠেকানোর জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের নামে জ্বালাও-পোড়াও হলেও জনগণ তাদের প্রতিহত করেছে এবং এবারও তেমন কিছু হলে জনগণ মোকাবিলা করবে বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচন হবেই। এ নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারো নেই।

সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা সরকার থেকে আরেকটা সরকারে যেতে যেন কোনো ফাঁক-ফোকর না থাকে। মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে গেলে সংসদ ভেঙে দিতে হয়। সংসদ কিন্তু কখনো শেষ হয়ে যায় না। যদি কোনো ইমার্জেন্সি দেখা দেয়, যদি কোনো যুদ্ধ দেখা দেয়, তখন ওই পার্লামেন্টের অনুমোদন নিয়েই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে।

বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক বড় প্লাটফর্মের আলোচনায় মিয়ানমারের সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি এসেছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিমসটেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। এ ছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি দিয়ে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রপাগান্ডামূলক একটি বই প্রকাশের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এভাবে ভুয়া ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু এটা তারা কার কাছ থেকে শিখল? আমাদের দেশেও তো হয়েছে। একেবারে কাবা ঘরের সামনে ব্যানার ধরার ছবির মিথ্যাচারও আমরা দেখেছি। সুতরাং, এসব মানুষের কাছে ধরা পড়ে যায়। মিয়ানমার সরকারও ধরা পড়ে গেছে।

সম্মেলনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছি, বাংলাদেশ বিমসটেকের মতো সহযোগিতামূলক প্লাটফর্মের সঙ্গে কাজ করে যাবে।

বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ওই দিন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। বিমসটেক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে যৌথ প্রচেষ্টা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার মাধ্যমে বিমসটেক ফোরামে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।

পিডিএসও/হেলাল