একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান এ মাসে

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৪৪

প্রতীক ইজাজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সেপ্টেম্বর মাসকে রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে বেশকিছু অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান হতে হবে এ মাসেই। কেননা নির্বাচন-সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে হবে ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই। কারণ ওই তারিখ থেকেই পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ক্ষণ-গণনা শুরু হবে। আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন।

আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বসছে বর্তমান জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন। সংবিধান অনুযায়ী, এক সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন ডাকতে হবে। ফলে এই অধিবেশনেই ভোটে ইভিএম ব্যবহারসহ নির্বাচন-সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ সংশোধনীর প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে। একইভাবে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

ফলে অক্টোবরে যেসব সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে, তার বেশিরভাগেরই চূড়ান্ত সমাধান হতে হবে এই সেপ্টেম্বরেই। অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হলে সে সরকার কেমন হবে, সেখানে বিএনপির প্রতিনিধি থাকবে কি না, টেকনোক্রেট থেকে অন্য কোনো দলের কোনো প্রতিনিধি রাখা হবে কি না— তা জানা যাবে এ মাসেই। এর জন্য আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সংলাপ বা আলোচনার কি হবে— সেটাও জানবে সবাই। ইভিএম ব্যবহার, নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে কি ধরনের সংশোধনী আসছে— তা যেমন এ মাসে চলা সংসদ অধিবেশনেই চূড়ান্ত হতে পারে; আবার এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে নির্বাচনী রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেয়- সে আভাসও মিলবে এ মাসে।

পাশাপাশি নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাবও প্রকাশ পাবে এ মাসে। নির্বাচন-সংক্রান্ত অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান সরকার বা ক্ষমতাসীনরা কীভাবে করে, সেদিকে যেমন নজর থাকবে সবার; তেমনি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের কি ধরনের অংশগ্রহণ থাকে, তাও বোঝা যাবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা এই দুই দলের বাইরে জোট রাজনীতির মেরুকরণও স্পষ্ট হবে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী কি বিএনপির জোটের সঙ্গেই থাকবে নাকি দলটি স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে রাজনীতি করবে সে সম্পর্কেও একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই সেপ্টেম্বরে।

ফলে এ মাসেই স্পষ্ট হবে নির্বাচনী রাজনীতি কোনদিকে যাচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে অমীমাংসিত রাজনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে; নাকি সমাধানের পথ খুলবে, স্বস্তির নির্বাচনী পরিবেশ দেখা দেবে দেশে— তা জানতে পারবে মানুষ। এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণও চলছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষ করে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, আর নিলেও সেক্ষেত্রে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই নাকি মুক্ত অবস্থায়; সে প্রশ্নই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। সেক্ষেত্রে সামনে চলে আসছে সব দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গটিও। এরই মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হবে— আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্য যদি সঠিক হয় তা হলে এই রায়কে কেন্দ্র করেও নতুন মেরুকরণ যুক্ত হবে নির্বাচনী রাজনীতিতে।

কেননা এই হামলার জন্য বিএনপিকেই মূলত দায়ী করে আসছে সরকার এবং এ মামলায় অভিযুক্তরাও সিংহভাগই এই দলের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরকে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে খুব সাবধানে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ মাসেই বোঝা যাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের মনোভাব। মূলত এ মনোভাবকে কেন্দ্র করেই দেশের নির্বাচনী রাজনীতির রূপ প্রকাশ পাবে। একইভাবে বিএনপিকেও খুব সতর্ক থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নানা কারণে দলটি কোণঠাসা। হাতে সময়ও কম।

সুতরাং, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে সময়ক্ষেপণ হয়। মূলত এ মাসই হবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য নেওয়া পরিকল্পনার উপযুক্ত সময়। বিশ্লেষকরা এমনও বলেন, এ মাসেই সমস্ত অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান হতে হবে। এ মাসেই বোঝা যাবে নির্বাচনী রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি। বিশেষ করে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাস এটি।

নির্বাচনকে ঘিরে এতদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক ও সংকটের সমাধান এ মাসেই হবে বলে আভাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারাও। এ ব্যাপারে সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা রয়েছে, সেপ্টেম্বরে তার অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে। জোট-মহাজোটের আকার, ভোটের অঙ্কের সমীকরণ, আসন ভাগাভাগি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আগাম সুসংবাদ কারা পাবেন, তাও জানা যাবে আসছে মাসেই। আর অক্টোবরে সব কিছু চূড়ান্ত হবে।

একইভাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও বলেন, বিএনপি নির্বাচনের ব্যাপারে নিশ্চুপ নেই। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও খালেদার মুক্তি একই সূত্রে আবর্তিত। মুক্ত খালেদা জিয়াকে নিয়েই বিএনপি আগামী নির্বাচনের পথে হাঁটবে। সময় হলেই দেশের মানুষ তা অনুধাবন করতে পারবে। নির্বাচনের আগে প্রতি মুহূর্তেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। আর আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। রাজপথেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবে বিএনপি।

বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোভাব কী- তা এ মাসে স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ অবশ্য অনেক আগে থেকেই নির্বাচনী মাঠে রয়েছে। এবার নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে— দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন সতর্কতার পর গত প্রায় এক বছর ধরেই দলটি মাঠে কাজ করছে। প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে বিএনপিসহ অন্যদেরও। আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছে ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এড়াতেও সতর্ক দলটি। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলার কৌশলে এগোচ্ছে তারা। ঠিক করে রাখছে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি ও কৌশল। বিশেষ করে এ মাসেই দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে চায় দলটি।

তবে বিএনপির জন্য কঠিন মাস হবে সেপ্টেম্বর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি এখন অনেকটাই কোণঠাসা। মুখে আন্দোলনের কথা বললেও গত ৫ বছর কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারেনি দলটি। সাংগঠনিক অবস্থাও দুর্বল। জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে। শেষপর্যন্ত খালেদা জিয়া মুক্তি পান কি না— তার ওপর নির্ভর করছে দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ। সেক্ষেত্রে বিএনপি কি করবে- তাও বোঝা যাবে এ মাসে। আবার এ মাসেই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে তারেক রহমানসহ বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতা সাজাপ্রাপ্ত হতে পারেন। অর্থাৎ এ মাসেই খোলাসা হবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্বাচনে অংশ নিতে পারা না পারার বিষয়টি।

আবার সরকার বা ক্ষমতাসীনদের জন্যও এ মাস অগ্নিপরীক্ষার। কেননা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির সমাধানের ওপর নির্ভর করবে নির্বাচনী রাজনীতি। যদিও এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলে আসছেন, নির্বাচনকালীন দেশে দায়সারা গোছের একটা সরকার হবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব কিছু পুরো নির্বাচনের দায়িত্ব ন্যস্ত হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। ছোট একটা মন্ত্রিসভা হবে। সেখানে সংসদের বাইরের কোনো দলের প্রতিনিধি রাখার সুযোগ নেই।

এসব ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে বসবে না তারা। সংলাপে বসার জন্য এখন বিএনপির সময় থাকলেও আওয়ামী লীগের নেই। জাতীয় ঐক্যের জন্য জাতীয় নির্বাচন অগ্রাধিকার পাবে; নির্বাচনের পরেই জাতীয় ঐক্যের জন্য সংলাপ হতে পারে। এ ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ভালো, তাই কমিশন জাতীয় নির্বাচনে এ প্রযুক্তির ব্যবহার করতে চাইলে সরকার তাদের সমর্থন করবে।

এ ছাড়া আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন কিংবা সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই এমন দল থেকে সাময়িক ওই সরকারের কোনো প্রতিনিধি রাখা হবে কী না- তাও এ মাসে খোলাসা হবে বলেও আভাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে এসব ইস্যুতে অনানুষ্ঠানিক সংলাপের আভাস দিয়ে রেখেছেন সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

পিডিএসও/তাজ