সেপ্টেম্বরে সংসদের শেষ অধিবেশন, অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার

সবার নজর এখন নির্বাচনে

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৫০ | আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৮, ০৯:০২

প্রতীক ইজাজ

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বসছে বর্তমান জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন। আর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে। অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতির আর মাত্র এক মাসের মতো সময় আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনকে ঘিরে সব বিতর্কের অবসান হতে হবে। সে মাসেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করে সর্বশক্তি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামতে হবে দলগুলোকে। এমন পরিস্থিতিতে তাই বেশ সরগরম এখন দেশের নির্বাচনী রাজনীতি। পার হচ্ছে নির্বাচনের এক বিশেষ মুহূর্তও।

সব নজর এখন সরকার, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ওপর। চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে চলমান রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়েও। বিশেষ করে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, আর নিলেও সেক্ষেত্রে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই নাকি মুক্ত অবস্থায়; সে প্রশ্নই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। সেক্ষেত্রে সামনে চলে আসছে সব দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গটিও। এরই মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হবে—আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্য যদি সঠিক হয় তা হলে এই রায়কে কেন্দ্র করেও নতুন মেরুকরণ যুক্ত হবে নির্বাচনী রাজনীতিতে। কেননা এই হামলার জন্য বিএনপিকেই মূলত দায়ী করে আসছে সরকার এবং এ মামলায় অভিযুক্তদের সিংহভাগই এই দলের।

বিশেষ করে নির্বাচনকে ঘিরে বেশ আলোচনায় কয়েকটি বিষয়। কেমন হবে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা? সেখানে টেকনোক্র্যাট থেকে শেষ পর্যন্ত বিএনপির ঠাঁই হবে কি? সংসদ ভেঙে নাকি বহাল রেখে আগামী নির্বাচন হবে? দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে—এ প্রশ্ন যেমন উঠছে; তেমনি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকারই বা কতটুকু ছাড় দেবে- আলোচনা হচ্ছে তাও।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোট রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেদিকেও তাকিয়ে সবাই। বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীকে বর্জন করবে, নাকি বিশেষ কৌশলে নির্বাচনী সঙ্গী হিসেবে সঙ্গেই রাখবে—এ আলোচনাও চলছে রাজনীতিতে। বিশেষ করে নির্বাচন কেন্দ্রিক জোট রাজনীতিও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই কিছু নতুন জোট গঠন হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের কথাও শোনা যাচ্ছে। এসব নতুন প্ল্যাটফর্ম শেষ পর্যন্ত কি রূপ নেয়, এগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় বা কেমন হয়- সেটাও বিবেচনা পাচ্ছে রাজনীতিতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এসব তর্ক-বিতর্কের অবসান হতে হবে এবং যথাসময়ে এসব সংকটের সমাধান হবে বলেও মনে করছেন তারা। এ মাসেই বোঝা যাবে নির্বাচনী রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি। বিদ্যমান সংকট কাটবে, নাকি আরো ঘণীভূত হবে—তাও স্পষ্ট হবে। একদিকে যেমন দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে, তেমনি আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা এই দুই দলের বাইরে জোট রাজনীতির মেরুকরণও স্পষ্ট হবে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী কী বিএনপির জোটের সঙ্গেই থাকবে নাকি দলটি স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে রাজনীতি করবে সে সম্পর্কেও একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত যা কিছু আলোচনায় সবই রাজনীতি ও নির্বাচনের অংশ। এসব এ দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিও। তবে এর জন্য সবাইকে সহনশীল হতে হবে। এবার নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো সংকট নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। সরকার সহযোগিতা করবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কালীন সরকার হবে। সেখানে সংকট তৈরির সুযোগ নেই। তবে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হতে পারে।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমনও বলেন, এবার বিএনপিকে আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। নতুবা নির্বাচন কমিশনে ওই দলের নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। সংবিধানের বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে অযৌক্তিক কোনো দাবি পূরণে তারা সরকারকে চাপও দিতে পারবে না। আর নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে নানা ধরনের আলোচনা থাকে। আশা করছি সব সংকটের সমাধান হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এমন আভাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। তিনি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা রয়েছে, আসছে সেপ্টেম্বরে তার অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে। জোট-মহাজোটের আকার, ভোটের অঙ্কের সমীকরণ, আসন ভাগাভাগি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আগাম সুসংবাদ কারা পাবেন, তাও জানা যাবে আসছে মাসেই। আর অক্টোবরে সব কিছু চূড়ান্ত হবে।

একইভাবে আগামী নির্বাচন প্রশ্নে কোনোভাবেই বিএনপি নীরব ভূমিকায় নেই এবং আগামী মাসেই সব জানা যাবে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও। তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও খালেদার মুক্তি একই সূত্রে আবর্তিত। মুক্ত খালেদা জিয়াকে নিয়েই বিএনপি আগামী নির্বাচনের পথে হাঁটবে। সময় হলেই দেশের মানুষ তা অনুধাবন করতে পারবে। নির্বাচনের আগে প্রতি মুহূর্তেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। আর আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। রাজপথেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবে বিএনপি।

বিশেষ করে সবার নজর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দিকেই। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ অবশ্য অনেক আগে থেকেই নির্বাচনী মাঠে রয়েছে। এবার নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে—দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন সতর্কতার পর গত প্রায় এক বছর ধরেই দলটি মাঠে কাজ করছে। প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে বিএনপিসহ অন্যদেরও। আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছে ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত যে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এড়াতেও সতর্ক দলটি। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলার কৌশলে এগোচ্ছে তারা। ঠিক করে রাখছে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি ও কৌশল।

এই মুহূর্তে এসে দল দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে মনোযোগ দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, আসন্ন এই নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকবে। বাকি আসনগুলো শরিকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, যার সংখ্যা ৬৫-৭০টির বেশি নয়। তবে দল বিএনপির সঙ্গে আগামী নির্বাচন ইস্যুতে কোনো ধরনের সংলাপে বসবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের জন্য জাতীয় নির্বাচন অগ্রাধিকার পাবে; নির্বাচনের পরেই জাতীয় ঐক্যের জন্য সংলাপ হতে পারে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন কিংবা সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই এমন দল থেকে সাময়িক ওই সরকারের কোনো প্রতিনিধি রাখা হবে কী না এসব বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

দলীয় সূত্র জানায়, ২৬ জানুয়ারি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ১৫টি টিমে বিভক্ত হয়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। ওই টিম এরই মধ্যে সাংগঠনিক জেলায় সফর শেষ করেছে। এ ছাড়া দলের প্রতিটি সংসদীয় আসনে দলের নেতারা যাচ্ছেন; বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এর বাইরে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশের বিভিন্ন এলাকা সফর করছেন।

অন্যদিকে, বিএনপিকে দৃশ্যমান নীরব মনে হলে ভেতর ভেতর দলটি নির্বাচনের পথেই হাঁটছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলের সূত্রমতে, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় সরকার, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সেনা মোতায়েন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ নানা দাবি দাওয়ার মাঝেই বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সম্প্রতি তৃণমূলের নেতাদের দেওয়া মতামতকে প্রাধান্য দিয়েই পরিকল্পনা আঁটছে। ঈদের কয়েক দিন আগে ৭৮ সাংগঠনিক জেলার নেতাদের মতামত পর্যালোচনা করতে দুই দিন বৈঠক করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। ওই বৈঠকে সাংগঠনিক জেলার ১৬০ নেতার বক্তব্য পর্যালোচনা করে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছে বিএনপি।

বিএনপির অধিকাংশ নেতার জোরালো মত, ২০১৪ সালের মতো আর নির্বাচন বর্জনের পথে যাওয়া ঠিক হবে না। নির্বাচন সামনে রেখে তাই দাবি আদায়ের পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। তবে আগের মতো লম্বা সময় নিয়ে আন্দোলনে যাবে না। এ লক্ষ্যে দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও এক ধরনের বোঝাপড়া চলছে। সব ঠিক থাকলে তফসিল ঘোষণার পরই মাঠে নামবে বিএনপি। এ জন্য দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি দলের সাবেক ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও কাজ করছে দলটি। এ ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত ও নেতাকর্মীদের মতামত এবং স্থানীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ভিত্তিতে একটি সারসংক্ষেপও তৈরি করা হচ্ছে। এ জন্য দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় মিলিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপি সবসময় প্রস্তুত। আলাদা করে প্রস্তুতির দরকার নেই। বিএনপির জন্য জনগণ অপেক্ষায় আছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপির জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।

পিডিএসও/হেলাল