ঢাকার ২ সিটিতে দ্বিগুণ অস্থায়ী কর্মী!

৭ বছরেও হয়নি জনবল কাঠামো

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১০:১২ | আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১৪:৪২

হাসান ইমন

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি) নিয়োগ বিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় সংস্থা দুইটিতে প্রতি বছরই বাড়ছে অস্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা। গত কয়েক বছরে সংস্থা দুইটিতে অস্থায়ী জনবল নিয়োগ হয়েছে ৮ হাজার ৫৬৩ জন। আর দুই সিটিতে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে চার হাজার ৩৪০ জন। এর মধ্যে পদশূন্য রয়েছে এক হাজারেরও বেশি। স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর চেয়ে অস্থীয় কর্মচারীর সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় দুই সিটির কার্যক্রম অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। আর গত ৭ বছরে জনবল কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিটি করপোরেশ নের কর্মকর্তারা।

দুই সিটির তথ্য মতে, ডিএসসিসিতে অস্থায়ীভাবে দৈনিক মজুরিভিত্তিক লোক নিয়োগ দিয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ জন। এরমধ্যে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে ৫ হাজার ২২২ জন। এ ছাড়ার ১৫০ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক এবং ৫০ জন মশক নিধন কর্মী (স্প্রে-ম্যান) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসিসিতে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কর্মরত রয়েছে দুই হাজার ৪১৩ ও স্কেলভুক্ত মাস্টাররোল অনুযায়ী, কর্মরত শ্রমিক রয়েছে ৬৯৮ জন। অস্থায়ী ভিত্তিতে মোট কর্মচারীর সংখ্যা হলো তিন হাজার ১১১ জন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কয়েক দফা মাস্টাররোলভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোনোরকমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এক দফা মাস্টাররোলভিত্তিক কিছু কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে তাদের দিয়েই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনের বক্তব্য- জনবল ঘাটতির কারণে আমরা এটা করতে বাধ্য হচ্ছি। আর দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন করতে আমরা প্রস্তুত। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পাঠাতে তারা দেরি করছে। এ কারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন করতে দেরি হচ্ছে।

এ ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়োগ বিধি এবং চাকরি বিধিমালা অনুমোদন না হওয়ায় বহুবিধ জটিলতারও সৃষ্টি হয়েছে। ডিএনসিসি নতুন সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করলেও ডিএসসিসি পুরাতন কাঠামো অনুসরণ করছে। ডিএসসিসিতে জনসংযোগ কর্মকর্তা ও প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা দুইজনই রয়েছে। এমন বিভিন্ন অসংগতির কারণে দুই সংস্থার প্রশাসনিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে পদোন্নতিও দেওয়া হচ্ছে না। এতে ক্ষুব্ধ দুই সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সূত্র মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গঠনের পর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দুই সংস্থার পক্ষে দুটি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ঢাকা উত্তরের জন্য ১ হাজার ৮৫৮ এবং ঢাকা দক্ষিণের জন্য ২ হাজার ৪৮২ জন জনবল চূড়ান্ত করে। দুই সিটি করপোরেশন মিলে ৪ হাজার ২৮০ জন। যদিও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মোট জনবল ছিল ৫ হাজার ১১৭ জন। ফলে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো। জনবল কমানো, বিভাগীয় প্রধান, উপপ্রধানসহ প্রত্যেক বিভাগের শীর্ষ পদেও বেশিরভাগ পদ প্রেষণের জন্য বরাদ্দ রাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পরে দুই সংস্থার প্রত্যেক বিভাগের মতামতসহ ওই সাংগঠনিক কাঠামো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পুনরায় পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে উত্তরের জনবল ১ হাজার ৮৫৮ জনের স্থলে ২ হাজার ৫০০ এবং দক্ষিণের ২ হাজার ৪৮২ জনের স্থলে ৩ হাজার ৪০০ করার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে প্রেষণের পদ কমানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। এরপর থেকে এটা নিয়ে ফাইল চালাচালি হচ্ছে, কবে সমাধান হবে তা দুই সংস্থার কর্তা-ব্যক্তিদেও কেউই জানেন না।

বিভক্তির পর দুই সিটি করপোরেশন ৭ বছর অতিবাহিত হলেও তৈরি করতে পারেনি নতুন অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো)। এখনো চলছে ১৯৮৯-৯০ অর্গানোগ্রামের আইনানুযায়ী। উপরন্তু পুরনো জনবল কাঠামো তাতেও এক হাজার ২৪০টি পদ এখনো শূন্য আছে। এই অর্গানোগ্রামে জনবল কাঠামোর সংখ্যা কম থাকায় কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দুই সিটির কর্মকর্তারা।

ডিএনসিসির জনবল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৮৩টি। যার মধ্যে এখনো ৬৭টি শূন্য পদ। দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৫টি অনুমোদিত পদের সংখ্যার মধ্যে ২৪টি শূন্য। এ ছাড়া তৃতীয় শ্রেণির এক হাজার ২৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫৩২টি ও চতুর্থ শ্রেণির ৫৫৩টি পদের মধ্যে শূন্য ৩৬৭টি। আর ঢাকা দক্ষিণের অনুমোদিত দুই হাজার ৪২২টি পদের মধ্যে ২৫০টি শূন্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই সিটির জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। রাজধানীতে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ ও পার্কের উন্নয়ন, নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাসহ অনেক কাজ করে থাকে সংস্থাগুলো। এর মধ্যে নতুন করে আরো ৩৬টি ওয়ার্ড যোগ হয়েছে। কাজের পরিধি বাড়লেও লোকবলের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এ অবস্থায় জনবল সংকটের কারণে এসব কার্যক্রম প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কমসংখ্যক জনবল দিয়ে কিছু কাজ করলেও মান ভালো হচ্ছে না বলেও জানান তারা। ফলে এত কমসংখ্যক জনবল দিয়ে সংস্থাগুলো পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে।

ডিএনসিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, গত সাত বছরে কাজের মান বেড়েছে। নতুন করে আরো ডিএনসিসিতে ১৮ ওয়ার্ড যোগ হয়ে বেড়েছে সীমানাও। নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। পুরনো রাস্তা সংস্কার হচ্ছে। অথচ জনবল কাঠামো না থাকায় লোক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

এই বিষয়ে ডিএসসিসি সচিব মো. শাহাবুদ্দিন খান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমাদের জনবল কাঠামো অনেক আগেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হয়ে যাবে বলে আশা করছি। এই কাঠামো চূড়ান্ত হলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলে কাজের মান আরো বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে অস্থায়ী শ্রমিকের অধিকাংশ ছাঁটাই করে দেওয়া হবে। আর কিছু রাখা হবে, কারণ নতুন বিধিমালাতেও জনবল কম দেখানো হয়েছে।

তবে ডিএনসিসিসির সচিব রবীন্দ্র বড়ুয়া বলেন, ৩৬টি ওয়ার্ড ছাড়াও নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডেও জনবল কাঠামো পরিধি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় নিয়োগ বিধি চূড়ান্ত করলে সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লোকবল নিয়োগ করা হবে।

পিডিএসও/হেলাল