নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই নিয়ে অব্যবস্থাপনার শঙ্কা

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১৫:৪৬

হাসান ইমন

কাল পবিত্র ঈদুল আজহা। রাজধানীতে জবাই করা হবে কয়েক লাখ কোরবানির পশু। দ্রুত কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩ ওয়ার্ডের এক হাজার ১৪৫টি স্থানে কোরবানির পশু জবাই করার স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

জবাই করা কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, এসব পশুর রক্ত ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলা এবং সুষ্ঠুভাবে মাংস বিতরণের জন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ওই দুই সিটি করপোরেশন। যাতে যেখানে সেখানে পশু জবাই করে রক্তের ও বর্জ্যরে দুর্গন্ধে নাগরিক পরিবেশ দূষিত না হয়। কিন্তু রাজধানীতে একদিনে লাখ লাখ পশু সীমিত জায়গায় জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণে সমস্যা সৃষ্টি হবে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। তারা বলেছেন, তবে এতে দেখা দিতে পারে চরম বিচ্ছৃঙ্খলা, হিমসিম খেতে হতে পারে আয়োজকদের।

তবে বাড়িতে পশু জবাই করতে হলে নিজ দায়িত্বে কোরবানির বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে পরিষ্কার করতে হবে, কোনো পরিস্থিতিতেই উন্মুক্তস্থানে রক্ত-বর্জ্য ফেলে রাখা যাবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ২০১৫ সাল থেকে কোরবানির পশু জবাইয়ের স্থান নির্ধারণ করে দিচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এবারও রাজধানীর পরিবেশ দূষণ রোধে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন নির্ধারিত স্থানে নগরবাসীকে পশু জবাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বছর কোরবানির ঈদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দুই লাখ ৭৫ হাজার এবং উত্তর সিটি করপোরেশনে দুই লাখ ২১ হাজার পশু জবাই হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, কোরবানির ঈদে প্রতি বছর রাজধানীতে কমবেশি ৫ লাখ পশু জবাই করা হয়। যেখানে সেখানে পশু জবাই করায় বর্জ্য অপসারণে ব্যাঘাত ঘটে। অনেক সময় বর্জ্য সরাতে কয়েকদিন সময় লাগে। ফলে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে একদিকে নগরীর পরিবেশ নষ্ট হয়; অন্যদিকে নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬০২টি এবং উত্তরে ৫৪৩টি স্থানে পশু জবাইয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে দুই ডিসিসি পশু জবাইয়ের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অধিকাংশ নগরবাসী। তাদের মতে, এতে ভালো কিছুর বদলে উল্টো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। অনেকেই এ নিয়মে ২০ শতাংশ পশুও জবাই করা যাবে কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া পশু জবাইয়ের স্থান নির্বাচন নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, একই দিনে সকলেই নির্ধারিত সময়ে একই সঙ্গে কোরবানির কাজ শেষ করতে চাইবেন। তাই এ নিয়ে সৃষ্টি হবে এক ধরনের প্রতিযোগিতা।

নগরীর একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাখ লাখ পশু জবাইয়ের জন্য এ কয়েকটি স্থান যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া এক বা একাধিক মসজিদের ইমাম বহুসংখ্যক পশু জবাই করার জন্য দীর্ঘ লাইনে পড়তে হবে। সেসব স্থানে কোরবানিদাতার পাশাপাশি গোশতগ্রহীতা দরিদ্র মানুষের ভিড় এবং চামড়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের উৎপাত সামাল দেওয়া যাবে কি না তা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া, দূরদূরান্ত থেকে নির্দিষ্ট স্থানে পশু নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য নামাজের পরই পশু নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করতে হবে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের সময় তাদের নাম উচ্চারণ করতে হয়। এ সময় কোরবানিদাতাদের সেখানে নিজে উপস্থিত থাকতে হবে। এ ছাড়া পশু কোরবানি দেওয়ার পর একটি অংশ সেখানে উপস্থিত গরিবদের মধ্যে বণ্টন করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে নিজ এলাকার দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই দিলে তা সম্ভব না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এলাকার দরিদ্ররা বঞ্চিত হতে পারেন।

এই বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সারা দেশে নির্ধারিত স্থানে কোরবানির পশু জবাই নিশ্চিত করতে দেশের সকল সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এসব সংস্থার পক্ষ থেকে সমগ্র দেশে নির্ধারিত স্থানের আয়োজন করবে। আর জনগণ চাইলে নিজেদের বাসা-বাড়িতেও কোরবানির পশু জবাই করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের নিজ দায়িত্বে পরিবেশবান্ধব উপায়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতে উন্মুক্ত স্থান বা সড়কে পশু জবাই করা যাবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, কেউ যদি এসব আইন নাও মানেন তবু আমরা কিছু বলব না। কেননা, এ ব্যাপারে কোনো আইন নেই, শাস্তিরও বিধান নেই। আর ধর্মীয় বিষয়ে শাস্তির বিধান রাখাও উচিত হবে বলে আমরা মনে করি না। জনগণকে এটা বুঝতে হবে; শহর বা গ্রামের সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশপ্রেমিক জনগণ হিসেবে এটা আমরা সকলের মেনে চলা উচিত।

ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ডিএসসিসি এলাকায় ৬২০টি পশু জবাইয়ের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব স্থানে পশু কোরবানি করার সুন্দর পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করব। নগরবাসীকে এসব স্থানে পশু জবাইয়ের জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। আশা করি, নগরবাসী আমাদের আহ্বানে সাড়া দেবেন। তবে আমার মনে হচ্ছে, এ বিষয়ে নগরবাসীর অভ্যস্ত হতে আরো সময় লাগবে।

পিডিএসও/তাজ