জাতীয় নির্বাচন : ফের ইভিএম বিতর্ক

প্রকাশ | ২১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০১৮, ০২:০৮

গাজী শাহনেওয়াজ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করতে চায় নির্বাচন কমিশন-ইসি। এ সিদ্ধান্তে নির্বাচনের রাজনীতিতে ফের বির্তক শুরু হয়েছে। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে একে কেন্দ্র করে দেওয়া ইসির নানা মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। এ বিতর্কের অবতারণা হচ্ছে কখনো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কথাতে, কখনো কমিশন সচিবের মন্তব্যে আবার কমিশনের সিদ্ধান্তের কারণে।

আর এসব বিষয়ে বিতর্কে জড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা দল-বিএনপি। এছাড়া জাতীয় ইস্যু হওয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে সুশীল সমাজও এ বিতর্কে পক্ষ হচ্ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, কারচুপি বন্ধে ইভিএমে ভোট হওয়াই শ্রেয়। অপরদিকে, বিএনপি বলছে, ইভিএম দিয়ে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নেই, এর দ্বারা ডিজিটাল কারচুপি সম্ভব। এর আগেও সংলাপে ইভিএম নিয়ে দল দুইটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল।

এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের আগে সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা সাংবিধানিক সংস্থার সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিকবোদ্ধারা। তারা বলছেন, কমিশনের সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ এবং সবাইকে নিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে যে সদিচ্ছা এসব অতিকথন ও সিদ্ধান্ত নতুন করে সংশয় বাড়াতে পারে। কারণ সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার খান মো নুরুল হুদা বলেন, জাতীয় নির্বাচনে কোথাও কোনো অনিয়ম হবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ তার নেই। নির্বাচনে কিছু অনিয়ম হয়েই থাকে; যোগ করেন সাংবিধানিক সংস্থার এই প্রধান।

এ কারণে সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়েন সিইসি ও কমিশন। তারা বলেন, দায়িত্বশীল পদে থেকে স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে কথা বলার আগে এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে তারপর কথা বলা উচিত। আগামীতে নির্বাচনসহ যেকোনো বিষয়ে সতর্কভাবে কথা বলার জন্য সিইসিকে পরামর্শ দেন সরকারি দলের নেতারা। অপরদিকে, বিএনপি সিইসির এই বক্তব্যেকে লুফে নিয়ে বলেন, সিইসি সত্য কথাটি আগে-ভাগেই বলে দিয়েছেন। এ ইস্যুতে সর্বদা বিরোধী অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক দফা বিতর্কে শামিল হন। আর এ বক্তব্যের পথ তৈরি করে দেন সিইসি নিজেই। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নয়, খোদ চার নির্বাচন কমিশনারও তার এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তারা সবাই বলেন, এটা ওনার (সিইসি) ব্যক্তিগত মত।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে কমিশনের মুখপাত্র সচিব মো. হেলালুদ্দীন বলেন, সংসদ নির্বাচনের শতকরা ৮০ ভাগ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এ কারণে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নতুন করে কোনো সংলাপ হচ্ছে না।

সচিবের এই বক্তব্যের পর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কারণ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব দলকে নিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে ইসি। এ নিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, আগে-ভাগে সংলাপের দরজা বন্ধ করে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে কমিশন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দীন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দল ইসির স্টেকহোল্ডার। সব কাজ ইসির এসব দলকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে নানা প্রয়োজনে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসা লাগতে পারে ইসির। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সেপথ আগে-ভাগেই বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায়। সাংবিধানিক সংস্থাটি কেন এত আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে প্রশ্নের সঠিক জবাব তারাই দিতে পারবেন, যোগ করেন এই সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।

সর্বশেষ বির্তক ইভিএম, যা জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার করতে চায় কমিশন। অথচ আরপিও সংশোধন হয়নি। এর আগেই আগামী নির্বাচনে এটা ব্যবহারে ব্যাপকভাবে মাঠে নেমে পড়েছে কমিশন। অথচ এই ইভিএম নিয়ে ইসির সংলাপে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম কর্মী, এনজিও প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধা-বিভক্ত ছিলেন। তারা বলেছিলেন, ইভিএমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে হবে। এখানে সফলতা এলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিশন মাত্র ৫-৬টি সিটি ও পৌরসভায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও সব নির্বাচনে প্রযুক্তিটি সফল হয়নি। এখন বিচার-বিবেচনা না করেই জাতীয় নির্বাচনের ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এরই মধ্যে ইসির মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

অথচ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা না করা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আছে। সংলাপে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ইভিএমের বিপক্ষে মত দেয়। তবে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী ফ্রন্ট, গণফ্রন্ট, তরিকত, সাম্যবাদী দল, জাকের পার্টিসহ কয়েকটি দল বলেছে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইভিএম ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐক্য না হলেও ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কিনছে ইসি। এর পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২১ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রতি ইউনিট ইভিএমের দাম পড়ছে প্রায় ২ লাখ টাকা।

হঠাৎ ইসির এই সিদ্ধান্তের বৈধতা দিতে থেমে যাওয়া আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নতুন করে শুরু করেছে কমিশন। আইন সংস্কার কমিটির সমন্বয়ক ও নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম গত রোববার বলেন, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনে এটি পাস করাতে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা।

তবে কমিশনের এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী বলেন, ইভিএম দিয়ে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এই মেশিনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নেই, এর দ্বারা ডিজিটাল কারচুপি হওয়া সম্ভব। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো অবস্থাতেই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এই মেশিন ব্যবহারের অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতে জনগণ প্রস্তুত।

আর আওয়ামী লীগের উপদেষ্ট পরিষদের সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ডিজিটাল যুগে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত তা সঠিক। কেননা কারচুপি বন্ধে ইভিএমে ভোট হওয়াই শ্রেয়। এ নিয়ে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই, যোগ করেন আইনজীবী পেশার সিনিয়র সদস্য এই প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা।

এর আগে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, সব রাজনৈতিক দল না চাইলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে না। এখন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে ইভিএমে ভোট করার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের ফিরেছে বিতর্ক।

"