আজও শনাক্ত করা যায়নি পলাতক ৪ খুনির অবস্থান

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ০৯:২০ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪০

জুবায়ের চৌধুরী

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ছয় আসামির মধ্যে দুইজনের অবস্থান জানা গেলেও বাকি চারজন কে কোথায় সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। রায় ঘোষণার ৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে আসামি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে সরকার। তবে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে চলমান আলোচনায় এখনো কোনো সুফল আসেনি।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় গেলে খুনি রাশেদ চৌধুরী ও নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। আনিসুল হক আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডায় আইন আছে যদি কোনো দেশে অন্যায়ের জন্য মৃত্যুদন্ড সাজা থাকে তাহলে তাকে সে দেশে পাঠানো হয় না। দেশ দুইটি শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ- মানে না। তাই ওসব দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর জন্যই তাদের ফেরাতে বিলম্বিত হচ্ছে। বাকি চারজনের সম্পর্কেও প্রাথমিক তথ্য রয়েছে সরকারের কাছে।

প্রতি বছরই ১৫ আগস্টের আগে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গটি সামনে আসে। কিন্তু এরপরই বিষয়টি নিয়ে আর কোনো আলোচনা চোখে পড়ে না। তবে কয়েক বছর ধরে নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে কানাডা এবং এম রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়। কিন্তু সে আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে তেমন কিছু জানা যায়নি। ওই দুই খুনিকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে গত ৯ বছরেও সুফল মেলেনি।

আজ বুধবার বঙ্গবন্ধুর ৪৩তম শাহাদতবার্ষিকীতে জাতীয় শোক দিবস পালন করছে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে সপরিবারে জীবন দিতে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে। তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে ২০১০ সালে। বাকিদের মধ্যে একজন মারা গেছেন এবং ছয়জন পলাতক আছেন। পলাতক আসামিরা হলেন আবদুুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। ২০০৯ সালে তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা আছে। এদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বলে নিশ্চিত রয়েছে ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বাকিরা কোথায় আছে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা না থাকলেও সম্ভাব্য যেসব দেশে তাদের অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে এনসিবি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে আজিজ পাশা ২০০১ সালের মাঝামাঝি জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এনসিবির সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক মহিউল ইসলাম জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, নূর চৌধুরী ও এম রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এ মুহূর্তে নতুন কোনো তথ্য নেই। মহিউল আরো বলেন, কিছুদিন আগে শোনা গিয়েছিল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় গেছে। কানাডার কাছে জানতে চাওয়া হলে তাদের দেশে রাশেদ নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এ কারণে আমরা নিশ্চিত যে রাশেদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় যাননি। ওই দুজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে জোরালোভাবে যোগাযোগ চলছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, দণ্ডিত বাকি চার আসামির মধ্যে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ভারতে রয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিম কখনো পাকিস্তান কখনো লিবিয়ায় অবস্থান করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। আবদুল মাজেদ রয়েছে সেনেগালে। এই চারজনের সবার অবস্থানই ‘সম্ভাব্য’ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এসব দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ‘ক্লিয়ার’ কোনো সংকেত মেলেনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি), বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (ল্যান্সার) ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি।

স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারের পথও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারের পথ খুলে যায়। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর ফের শ্লথ হয়ে যায় মামলার গতি। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দণ্ডিত পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

পিডিএসও/হেলাল