বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা : পথ হারিয়ে ফেলে দেশ

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৪২ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪০

প্রতীক ইজাজ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে বাংলাদেশ। এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে দেশ কেবল ব্যক্তি শেখ মুজিবকেই হারায়নি; বিশাল ক্ষতি হয়ে যায় দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির। গোটা দেশ নিশ্চল হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিশ্ব থেকেও। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেমে যায়। দেশের মানুষ এক অন্ধকারে নিপতিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের ২১ জুন বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত টানা ২১ বছর পেছনে হাঁটে দেশ। এই দীর্ঘ সময় দেশ রূপ নেয় চরম বিশৃঙ্খলায়।

অবশ্য এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ছয় বছরের মাথায় দেশে প্রথম পালাবদলের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুর বেঁচে যাওয়া দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও ছন্দপতন দূর হয় রাষ্ট্রের। ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। যুগপৎ আন্দোলনে স্বৈরশাসকের পতন হয়। ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। সেই থেকে ধীরে ধীরে দেশ উল্টোযাত্রা থেকে ফিরতে শুরু করে।

তবে দীর্ঘ ২১ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর ১৯৯৬ সালের ২১ জুন আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে প্রথম উন্নয়নের ধারায় ফেরে দেশ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। পেছনে হাঁটা রাষ্ট্র আবার এগোতে থাকে সামনে। এ সময় দেশ ও জনকল্যাণের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনা অনন্য ভূমিকা রাখেন। উল্টোপথের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিছক কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না। নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞ ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মূলনীতিকে হত্যা করার প্রচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সামগ্রিক চরিত্রের ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রভাব ফেলে। স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিপুল প্রশংসা কুড়ায় বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই নিন্দার ঝড় বয় বিশ্বে। বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিভিন্ন রাষ্ট্র।

বিশ্লেষকরা এই হত্যাকাণ্ডকে দেখেন দেশকে পাকিস্তানি চিন্তা-চেতনায় ও আদর্শে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে। তাদের মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের মৌলিক চরিত্রকেই বদলে ফেলা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তানি ধারায় সামরিক শাসনের সংস্কৃতির প্রবর্তন ঘটে দেশে। সাম্প্রদায়িকতা ফিরে আসে রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার ওপর খড়গ নেমে আসে। দেশের মানুষের জীবনাচারেও ভিনদেশি বা পাকিস্তানি ভাবধারার সাংস্কৃতিক চর্চা আনার অপচেষ্টা চলে। একের পর এক স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা ঘটতে থাকে দেশে।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, ইতিহাসের কলঙ্কময় এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। সব ধরনের মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গ ফিরে আসে। বাংলাদেশকে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। এতে করে আমরা আবার আমাদের বাঙালিত্বকে হারিয়ে ফেলি। বাঙালিত্ব এবং বাঙালিত্বের অনুষঙ্গের ওপর শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। অর্থাৎ বাঙালিত্বের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার বিকাশের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

‘পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে’ উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ক্রমেই পিছিয়ে যেতে থাকে। মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার হারিয়ে যায়। উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নেতিবাচক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। বাঙালির চেতনার ওপর আঘাত আসতে থাকে। তবে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার আগের দীর্ঘ ২১ বছর মোটা দাগে চার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা। ক্ষেত্রগুলো হলো—রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি।

বিশ্লেষকরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে প্রথম ধর্মের সঙ্গে এ দেশের মানুষের সংস্কৃতি ও সংবিধানের সংঘাতময় রাজনীতির শুরু বলে মনে করেন। তাদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি তুলে সস্তা জনপ্রিয়তা নেওয়ার জন্য সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ঢোকানো হয়। ইনডেমনিটি অ্যাক্ট জারি করে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা জাতীয় চার নেতাকেও হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানাকে দেশে আসতে দেয়নি। ১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মেজর জিয়াউর রহমান ভারতের চাপের মুখে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ঢুকতে দিলেও ৩২ নম্বরে ঢুকতে দেননি। তখন ৩২ নম্বরের রাস্তায় বসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিলাদ দেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, পঁচাত্তরের পর অনেক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। ক্ষমতার পালাবদলে পাকিস্তানি দোসররাও সরকার গঠনে সুযোগ পায়। রাজকারদের গাড়িতে ওড়ে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা। বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দিতে চলে ইতিহাস বিকৃতির উৎসব। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার না করে উল্টো ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেন। গণহারে মুক্তিযোদ্ধা-সেনা অফিসারদের হত্যা করেন। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর বাহিনীর প্রধান গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনেন। কারাগার থেকে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে মুক্তি দেন। ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যে শেখ মুজিব, তার পরিবার ও চার নেতা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গঠিত কমিটিকে দেশে আসতে ভিসা দেয়নি জিয়া সরকার। এমনকি ১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনাকে দমিয়ে রাখার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্র কম চেষ্টা করেনি। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যার জন্য ১৯ বার চেষ্টা করা হয়েছে।

ইতিহাসের এই গবেষক আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেশের রাজনীতির দ্রুত পটপরিবর্তন হয়। হত্যাকারীরা বাংলাদেশ বেতারের নাম পাল্টে রেডিও বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করে। তাদের বিভিন্ন ঘোষণার ফাঁকে ফাঁকে হিন্দি-উর্দু গান প্রচার করে। ১৫ আগস্টের এই হত্যাকান্ডের পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি (১৯৭১ থেকে এ সময় পর্যন্ত সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি) দিয়ে সৌদি বাদশাহ খন্দকার মোশতাককে যে অভিনন্দন বাণী পাঠায় তাতে বাংলাদেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ের পর বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার।

পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর দেশে হত্যা-ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু বলে মনে করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে উনিশটি ক্যু, জেলখানার অভ্যন্তরে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যের ফাঁসি, সামরিক বাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঝেটিয়ে বের করে দেওয়া—এসবই ছিল ১৫ আগস্ট-পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কেবল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নয়, দেশের রাজনীতিতেও এ ধরনের হত্যা-হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়। পুনর্বাসিত জামায়াতে ইসলামী নতুন প্রজন্মের ওপর তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে রগ কাটা, চোখ তোলা, হাত কাটা ও হত্যা-হামলার নৃশংস এক অধ্যায়ের সূচনা করে। বর্তমানের নৃশংস জঙ্গিবাদী তৎপরতার উৎস বিএনপি আশ্রিত জামায়াতে ইসলামীর এই সহিংস সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতি সূত্রপাত বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী বিএনপি সরকারের রাজনীতির ফসল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির ক্ষতির এক হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার কারণে ১৯৭৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছরে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৯ কোটি ডলার।

এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতে বাংলাদেশ প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হবে বলে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এত দিনে বাস্তবায়ন হতো। শূন্য গুদামঘর, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে ৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত আর কখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

এ ব্যাপারে অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্নকেই হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে ১৯৯৪-৯৫ সালেই মাথাপিছু জিডিপিতে মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যেত বাংলাদেশ। ২০১১ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয় দাঁড়াত ৪২ হাজার ৫১৪ কোটি ডলার। ওই সময় মালয়েশিয়ার মোট জাতীয় আয় ১৫ হাজার ৪২৬ কোটি ডলার।

‘বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে ১৯৭৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গড়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতো’ জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কারণে ১৯৭৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৬ বছরে দেশের অর্থনীতির পুঞ্জীভূত ক্ষতির পরিমাণ ৩ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার।

পিডিএসও/হেলাল