সড়কে এখনো বাসের রেষারেষি

ট্রাফিক সপ্তাহে চলছে ফিটনেস ও লাইসেন্স পরীক্ষা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

রেষারেষিতে মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্র বিক্ষোভ শেষ হতেই আগের মতো বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছেন চালকরা। অশুভ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী নামানো-ওঠানো। একই পথের ভিন্ন কোম্পানির বাসের মধ্যে যাত্রী তোলা নিয়ে রেষারেষি চলছেই। থামেনি অতিরিক্ত যাত্রী তোলাও। আইন না মেনে উল্টো পথে গাড়ি চালানোও থেমে নেই। ফুটওভার ব্রিজে চলার মানসিকতাও আগের মতোই।

এখনো পথচারীরা যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। মুঠোফোন ব্যবহার করছেন চালকরাও। সব মিলিয়ে ‘যে লাউ সেই কদু’র মতো অবস্থা। তবে নগরীর টার্মিনালগুলোতে মালিকদের অভিযান ও ট্রাফিক সপ্তাহ চলার কারণে সড়ক জুড়ে লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহন চোখে পড়েনি। রাস্তায় গণপরিবহন ও কম দেখা গেছে।

গত চার দিনের মতো রাজধানীতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ফিটনেস, রুট পারমিট, রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করা হয়। মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে রাস্তায় শৃঙ্খলা আনার কথা ঘোষণা দেন। রাস্তায় নামেন খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। কিন্তু এত সবের মধ্যেও কোথাও নিয়ম মানতে দেখা যায়নি কাউকেই। তবে সকাল থেকে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রী তোলার আগে যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখেছে পরিবহন মালিক সমিতি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া অনুমতি মেলেনি যানবাহন চলাচলের।

এদিকে, পুলিশের বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ এবং বিআরটিএর বিশেষ অভিযানের কারণে গতকাল সড়কে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যাও ছিল কম। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন, লাইসেন্স, ফিটনেস, বিমার কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। ফলে যাত্রীরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও বাসে উঠতে পারেননি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে পুলিশ নৈতিক ভিত্তি পেয়েছে। সব জায়গায় পুলিশ হাত দিতে পারছে। বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে জনগণের মধ্যেও আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হবে।

মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় দেখা যায়, বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা সড়কের মাঝামাঝি চলে এসেছেন। একটি বাস এলে যাত্রীরা তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। বাসচালকরা সড়কের মাঝখানেই বাস থামিয়ে যাত্রী নামাচ্ছেন, ওঠাচ্ছেন। পেছনে অন্য বাস, গাড়ি অনবরত হর্ন দিয়ে যাচ্ছে। আয়াত পরিবহনের একটি বাসকে দেখা যায় চলন্ত অবস্থাতেই যাত্রীদের নামাচ্ছে, আবার চলন্ত বাসেই যাত্রীরা লাফিয়ে উঠছেন। এর মধ্যে পেছনে এসে দাঁড়ায় ল্যাম্পস পরিবহনের একটি বাস। দুটি বাসের চালকের সহকারীরা ‘ফার্মগেট, ফার্মগেট’ বলে যাত্রী তুলছেন। ল্যাম্পস পরিবহনের চালক বিপজ্জনকভাবে আয়াত পরিবহনের বাসটি ওভারটেক করেন। আয়াত পরিবহনের সামনে এসে কয়েকজন যাত্রী তুলেই দ্রুতগতিতে চলে যায় ল্যাম্পস পরিবহনের বাসটি।

বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী আব্বাস উদ্দিন বলেন, বাস না থামলে লোকজন কী করবে? বাধ্য হয়েই লাফিয়ে ওঠা লাগছে। যাত্রীদের দাঁড়ানোর জন্য নির্ধারিত কোনো জায়গা বা স্টপেজ নেই। তাই সবাই সড়কের ওপরেই দাঁড়াচ্ছে।

মিরপুর ১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পদচারী-সেতুর নিচে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন যাত্রীরা। অথচ বাস দাঁড়ানোর নির্ধারিত জায়গা এর থেকে কিছুটা সামনে। বাসচালকরা এসে পদচারী-সেতুর নিচে গতি কিছুটা কমিয়ে চলন্ত বাসেই যাত্রী তুলছেন। কোনো বাসই নির্ধারিত স্থানে গিয়ে থামছে না।

মহাখালী এলাকায় দেখা যায়, স্কাই লাইন পরিবহনের একটি বাস চলন্ত অবস্থায় সড়কের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী নামাচ্ছে। কয়েকজন যাত্রী দৌড়ে এসে ওই চলন্ত বাসে লাফিয়ে উঠছেন। যাত্রীরা যাতে পড়ে না যায় সে জন্য চালকরা সহকারী টেনে তুলছেন।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির অন্যতম ছিল বাসে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই না করা। গতকাল অধিকাংশ বাস ছিল যাত্রীতে বোঝাই। বাসগুলোর পাদানিতে ও গেটের বাইরেও যাত্রীদের ঝুলতে দেখা যায়। অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হলেও এসব বাসে আদায় করা হয় সিটিং সার্ভিসের ভাড়া।

এদিকে, বাস টার্মিনালগুলোতে গণপরিবহনের কাগজপত্র ঠিক আছে কি না তা চেক করেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ও কমিটিগুলো। দুপুরে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে গাড়ির কাগজপত্র চেক করতে দেখা গেছে।

দুপুর ১২টা থেকে সায়েদাবাদ টার্মিনালে চার শতাধিক পরিবহনের কাগজপত্র চেক করা হয়েছে। ৩০-৪০টির মতো গাড়িতে কাগজপত্র আপডেট পাওয়া যায়নি। বাকি গাড়ি টার্মিনাল ছেড়ে গেছে।

এ টার্মিনালে চেকের দায়িত্বে রয়েছেন সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও শ্রমিক কমিটির নেতা রাজু আহমেদ বলেন, আমরা সকাল থেকেই কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত (দুপুর ২টা ২০ মিনিট) ৪০০ গাড়ি চেক করেছি। এর মধ্যে অধিকাংশের কাগজপত্র ঠিক আছে। আর যেসব গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই সেগুলো টার্মিনাল থেকে বের হচ্ছে না।

টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের হওয়ার আগে কাগজপত্র চেক করা হচ্ছে দুপুরের দিকে সায়েদাবাদ টার্মিনালে থেকে গাড়ি বের হওয়ার আগেই মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলোর চেকারদের চালক ও হেলপাররা কাগজপত্র দেখিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সকাল থেকে মহাখালী টার্মিনালে আমাদের প্রতিনিধিরা চেক শুরু করেছে। দুপুরের দিকে শুরু হয়েছে সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানে। যেসব গাড়ির কাগজপত্র নেই সেসব মালিক তা আপডেট করে নিচ্ছেন।

সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। অবৈধ পরিবহন বা কাগজপত্রবিহীন কোনো পরিবহনকে ছাড় দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান জিরো ট্রলারেন্স।

মহাখালী বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের যা যা করণীয় তাই করছি। কাগজপত্র ছাড়া কোনো গাড়ি ছাড়তে দিচ্ছি না।

পিডিএসও/তাজ