নিরাপদ সড়ক

সংস্কার প্রয়োজন সব খাতেই

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:৫২

জুবায়ের চৌধুরী

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এবার বেশ জোরেশোরে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতেও কাজ শুরু হয়েছে। রাজধানীতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সড়কে নেমে বিশৃঙ্খলা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সড়কে অবস্থান ছিল টানা এক সপ্তাহ। এতে অচল হয়ে পড়ে গণপরিবহনহীন রাজধানী। ভোগান্তি বাড়ে রাজধানীর মানুষের। তবুও নগরবাসী শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে। সরকারও বসে নড়েচড়ে। সড়ক পরিবহন আইনের চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। খসড়ায় দুর্ঘটনায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রাণহানি ঘটালে মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে সাজা বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে ডিএমপি ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করে। চলমান এই ট্রাফিক সপ্তাহে চালকদের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সবকিছুই আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোরভাবে পরীক্ষার কাজ চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সড়কে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নানা খাতে সংস্কার।

এসবের মধ্যে রয়েছে বাসের রুট কমিয়ে আনা, চালককে চুক্তিতে নিয়োগ না দিয়ে বেতনভুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন এবং চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা। ঢাকাসহ সারা দেশে সড়কে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। ওভারটেকিং ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি চালকের অদক্ষতা এসব দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী। অধিকাংশ চালকেরই নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) মনে করছে, চালকের অদক্ষতা, যান্ত্রিক ত্রুটি, চালক ও পথচারীদের অসাবধানতা প্রভৃতি কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা না গেলেই অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়।

বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের জন্য অনেকাংশে মালিকরাই দায়ী। কারণ মালিকরা প্রতিদিন বাসটি চুক্তিতে চালকদের হাতে ছেড়ে দেয়। ফলে চালকদের মাথায় সব সময় চুক্তির বাইরে আরো বেশি টাকা আয় করার চিন্তা থাকে। আবার ঢাকা শহর যেহেতু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে সেজন্য এখানকার রাস্তার নেটওয়ার্কও পরিকল্পিত নয়। ঢাকা শহরে উত্তর-দক্ষিণমুখী সড়ক বেশি থাকলে পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়ক খুবই কম।

বেসরকারি এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়ই দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে মাসে ৯০০ জন এবং বছরে ১০ হাজার ৮০০ জন মারা যাচ্ছে। তবে বিআরটিএ বলছে, এ সংখ্যা দিনে ১৬ এবং বছরে ৫ হাজার ৭৬০। অনেকে বলছেন, সড়কে মৃত্যু যাই হোক এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সন্ত্রাসীদের হাতে শতকরা ৩০ জন লোক মারা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭০ জন। ৩০ জনের জানমাল রক্ষায় সরকারি বাহিনী থাকলে ৭০ জনের জীবন রক্ষায় অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন তারা।

প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যক্ষ করতে চায় দেশবাসী। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সেই পথ দেখিয়েছে। সরকারও তাদের দেখানো পথে হাঁটতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

বাস রুট কমানোর চিন্তা সরকারের : সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার ভেতরে চলমান সিটি বাসগুলোর ৩৫৯টি রুটকে মাত্র ২২টি রুটে বিন্যাস করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। তার সে উদ্যোগে শামিল ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকনও। তবে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর সে প্রকল্পে ভাটা পড়ে। সম্প্রতি প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সেই পথেই এগোতে চাচ্ছে সরকার। ঝিমিয়ে পড়া সে উদ্যোগও বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

আনিসুল হক বিদ্যমান ৩০০টির বেশি বাস কোম্পানিকে মাত্র ৬টি কোম্পানিতে রূপান্তরের পরিকল্পনায় করেছিলেন। তিনি সেসব কোম্পানির নামও দিয়েছিলেন যথাক্রমে পিংক সার্ভিস, ব্লু সার্ভিস, পেস্ট সার্ভিস, অরেঞ্জ সার্ভিস, ইয়েলো সার্ভিস ও গ্রিন সার্ভিস। তাছাড়া আগামী কয়েক বছরে ৪০০ নতুন বাস রাস্তায় নামানোর পরিকল্পনায় ছিল। তিনি গুলশান, বনানী, নিকেতন ও বারিধারায় ‘ঢাকার চাকা’ নামে বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করেন। যা এখনো চলছে। এসব এলাকায় ‘ঢাকার চাকা’র বাস ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির বাস নেই। এতে অভিজাত এসব এলাকা আরো নিরাপদ হয়েছে।

চুক্তিতে নয়, চালকদের বেতনে অন্তর্ভুক্ত : দীর্ঘদিন ধরে বাস চালকরা চুক্তিতে গাড়ি চালিয়ে আসছেন। এতে অধিক ট্রিপের জন্য বাস চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। আগে যেতে অন্য বাসকে ধাক্কা দিয়ে চলছিল বাস। বাস চালকদের এই প্রতিযোগিতায় এ পর্যন্ত অসংখ্য লোকের প্রাণ গেছে। তবু তাদের বেপরোয়া মনোভাব থামেনি। শুধু তা-ই নয়, বাস চালকদের বেশির ভাগেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। দীর্ঘদিন ধরে সড়কে এ ধরনের নৈরাজ্য চলে আসছে। তবে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে অসম সে প্রতিযোগিতা কমে এসেছে।

এদিকে গত বুধবার রাজধানীর রাস্তায় চুক্তিভিত্তিক এবং ফিটনেসহীন বাস চালানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। আর তাই গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে পরিবহন কর্তৃপক্ষকে ড্রাইভার নিয়োগ দিয়ে গাড়ি রাস্তায় নামাতে হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, নিয়ম না মেনে গাড়ি চালালে নিবন্ধন বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে আমাদের। তিনি আরো জানান, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া এবং কোনো ফিটনেসবিহীন বাস চলতে দেওয়া হচ্ছে না।

সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইনের প্রয়োগ : দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার ছাপ দীর্ঘদিনের। ট্রাফিকে শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর এক প্রকল্প ভেস্তে গেছে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে। একাধিকবার ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেম চালু করেও ধরে রাখতে পারেনি ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। ফলে শত কোটি টাকার প্রকল্প জলে ডুবে যায়। আর ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন তো অনেক দূরের কথা।

রাজধানীতে যানজট আর ট্রাফিক সিস্টেম ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ফুটপাত দখল ও সড়ক দখল করে গাড়ি পার্কিং। ট্রাফিক বিভাগ এ দুইটিতে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। নিয়ম রক্ষায় মাঝে মধ্যে কিছু অভিযান চালিয়েই দায়িত্ব শেষ করে তারা। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেয়ে মামলা দিয়ে টাকা কামানোকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। যার কারণে এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগে সাফল্য নেই ট্রাফিক বিভাগের।

চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা : বাস চালকদের বেশির ভাগই গাইতে গাইতে গায়েন। সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ির স্টিয়ারিং তাদের হাতে চলে আসে। বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে চালকরা। বছর পাঁচ-ছয়ের মধ্যে স্টিয়ারিং ধরে ফেলে তারা। এজন্য কোনো প্রশিক্ষণ থাকে না। ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই তাদের। পরিবহন খাতে এ বড় নৈরাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন প্রভাবশালী মহল। তবে এখন এই নৈরাজ্য বন্ধে তৎপরতা বেড়েছে সরকারের। সম্প্রতি লাইসেন্স, গাড়ির রুট পারমিট এবং প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র নিতে বিআরটিএতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিনই হাজার হাজার লোক ভিড় করছেন বিআরটিএ নির্ধারিত কার্যালয়গুলোতে। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে গাড়ির সংখ্যাও কমে গেছে।

এদিকে, দক্ষ গাড়ি চালক তৈরিতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে বুধবার (৮) চিঠি দিয়েছে বিআরটিসি। এজন্য অতিরিক্ত ১২ কোটি ৬ লাখ টাকা চেয়েছে সংস্থাটি। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটি আরো গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। বিআরটিসির ম্যানেজার (পরিকল্পনা) আবু বকর সিদ্দিক জানিয়েছেন, পাঁচ বছরে এক লাখ দক্ষ চালক তৈরি করা হবে। এর মধ্যে বিআরটিসি তৈরি করবে ৩৬ হাজার। প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কিন্তু আমরা এক টাকাও বরাদ্দ পাইনি। বরাদ্দ না পেলে কীভাবে কাজ শুরু হবে।

যাত্রীদের মানসিকতার পরিবর্তন : ঢাকায় চলাচলকারী বাসগুলো যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করে আসছে। সিটিং সার্ভিসের নামে দীর্ঘদিন চলছে চিটিং সার্ভিস! এ ধরনের নৈরাজ্যে বন্ধে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ সফল হয়নি। এসব নৈরাজ্য মেনেই চলছে বাস। বাস নৈরাজ্য ঠেকাতে যাত্রীদের মানসিকতাও জরুরি। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে গড়ে উঠা এ নৈরাজ্য বন্ধে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই যাত্রীদের। তবে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সে ঘটনাকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।

পিডিএসও/রিহাব