বিআইপি'র সংবাদ সম্মেলন

সড়ক পরিবহন আইনে মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থ প্রধান্য পেয়েছে

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১১

নিজস্ব প্রতিবেদক

মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইনে (প্রস্তাবিত) বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি একমাত্রিক উপস্থাপন করার পাশাপাশি চালকের উপর সড়ক দুর্ঘটনার অধিকাংশ দায়ভার পালানো হয়েছে। এরপাশাপাশি আইনে সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তার বহুমাত্রিকতা স্থান পায়নি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।  বুধবার রাজধানীর বাংলামটরস্থ প্ল্যানার্স টাওয়ারে ‘প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন ও সড়ক নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির পক্ষথেকে এমন অভিমত জানানো হয়।

সংগঠনটির মতে, সড়কের পরিকল্পনা, ডিজাইন, তদারকি, গণগত মান এবং যানবাহনের ফিটনেস তদারকি, যানবাহনের ড্রাইভার ও শ্রমিকের তদারকি, ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাসহ সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত অনুষঙ্গগুলো সংযুক্ত হয়নি। এতে সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরী ব্যক্তি, বাস মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা জনিত দায়মুক্তির সুযোগ রয়েছে। তাই এসব অনুষঙ্গগুলোকে বাদ দিয়ে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্বব নয়।

সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বিআইপি’র সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম আবুল কালামের সভাপতিত্বে সংগঠনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান, বতর্মান সহ-সভাপতি অধ্যাপক আজগর মাহামুদ, যুগ্ম সম্পাদক মাজহারুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।

বিআইপি’র সভাপতি আবুল কালাম বলেন, শুধু আইন করেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। দুর্ঘটনা না ঘটে তার জন্য সুষ্ঠু এবং পরিকল্পিত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলতে হবে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিআরটিএ-র সেবার বিকেন্ত্রীকরণ প্রয়োজন। 

বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল বলেন, প্রস্তাবিত আইনে হত্যার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট গাড়ি দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটিতে কারা থাকবেন তার বিশেষ বর্ণনা অনুপস্থিত। এই তদন্ত কমিটিতে উপযুক্ত কারিগরি লোক নিশ্চিত না করা গেলে হত্যাকান্ড প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়বে। আইনে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করা এবং দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য স্বতন্ত্র সেল গঠন করা প্রয়োজন। আইনের বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রণয়নের জন্য অচিরেই বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। সড়কে নারী নিরাপত্তাসহ বিশেষ ইস্যুতে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন দরকার। প্রস্তাবিত আইনে কোন দুর্ঘটনায় ‘গুরুতরভাবে কোন ব্যক্তি আহত হলে’ শব্দটি আইনের প্রয়োগে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরী করে দেবে। তাই শব্দটি বাতিল করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সারাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত ট্রাফিক মনিটরিং সেল এবং বিশেষ ট্রাফিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন।

ড. আদিল আরও বলেন, দেশের গাড়ির গতিসীমা সম্পর্কিত কোন আইন নেই। দেশের বিভিন্ন সড়কের জন্য গাড়ির সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম সীমা নির্ধারণ করে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনি কাঠামো ও পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য চালক ও সহযোগীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অত্যন্ত জরুরী। এজন্য নিয়মিতভাবে চালক ও সহযোগীদের বাৎসরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। চালকদের মাদকাসক্তির কারনে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারনে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। মাদকাসক্ত চালকদের চিহ্নিত করে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। গাড়ি চালানো একটি বিশেষায়িত পেশা বিবেচনায় নিয়ে গাড়ি চালকদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত যা তার মানসিক উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে। যানবাহন শ্রমিকদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত না করে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রস্তাবিত আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ মেরিট পয়েন্টের বিষয়টি প্রশংসার দাবী রাখে। আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিলের ধারার সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত আইনের নানা বিষয় ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল বলেন, আমরা নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত এবং যৌক্তিক দাবীকে সমর্থন করি। শিক্ষার্থীদের এই দাবীকে নাগরিক হিসেবে মৌলিক অধিকার মনে করি এবং সারাদেশে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে সকলে জন্য নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন করা সম্ভব। 

এছাড়া, বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় প্রস্তাবিত আইনের নামকরন ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ করার প্রস্তাব পেশাজীবী ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে এরূপ সামাজিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে করা হলেও বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। তাই চূড়ান্ত আইনের নামকরণে সড়ক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তার সকল অনুষঙ্গ বিবেচনায় নিয়ে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা দরকার। এছাড়া প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবিত শাস্তির যে বিধি-বিধান রাখা হয়েছে, তা নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করতে পর্যাপ্ত নয় এবং বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য অনেক আইনের ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রস্তাবিত আইনে বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারনে দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত হলে চালককে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে যা পর্যাপ্ত নয় এবং এর মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। যে কোন অপরাধের সর্বোচ্চ সীমা অপরাধের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এবং অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখে। এরূপ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদন্ড হওয়া উচিত। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে বিভিন্ন ধারায় কারাদন্ডের বিকল্প হিসেবে অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিআইপি মনে করে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ের সাথে মানুষের জীবন সরাসরি জড়িত বিধায় প্রস্তাবিত অর্থদন্ডের পরিমাণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও বাড়ানো উচিত এবং কারাদন্ডের পরিবর্তে অর্থদন্ডের সুযোগ বাতিল করা উচিত।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, উন্নত অনেক দেশে বিভিন্ন আইনভঙ্গের শাস্তির বিকল্প হিসেবে দোষী ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক কমিউনিটি সার্ভিসে অংশগ্রহন করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ও ক্ষুদ্র ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য সামাজিক সেবা প্রদানে ট্রাফিক আইনে অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে সড়ক ও সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, সড়ক পরিহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক আইন এর সঠিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গাড়িচালক ও হেলপারদের জন্য ম্যানুয়াল প্রস্তুত করা প্রয়োজন। একইসাথে ড্রাইভিং ইনস্ট্রাকটরদের জন্য ম্যানুয়াল প্রবর্তন করা দরকার। এ লক্ষ্যে পরামর্শ প্রদানের জন্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিআরটিএ’কে সম্পৃক্ত করে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটিতে সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জাতীয় পর্যায়ের পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি থাকতে পারে। 

পিডিএসও/রানা