ইসিতে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০৯:১০

গাজী শাহনেওয়াজ

ধারাবাহিক কয়েকটি সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচন কমিশন এবার পূর্ণ মনোনিবেশ করেছে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে। এবারের নির্বাচনে ভোটার বেড়েছে প্রায় এক কোটি। সে কারণে বেড়েছে ভোটকেন্দ্রও। আর ভোটকেন্দ্র বাড়ায় সঙ্গত কারণে বেড়েছে ভোট-গ্রহণকর্মী।

আগামী ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ হিসাবে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি গুছিয়ে নিতে চায় ইসি। এর মধ্যে থাকছে নির্বাচনী সামগ্রীসহ সব স্তরের কেনাকাটাসহ সামগ্রিক প্রস্তুতি। আসছে অক্টোবরে চলবে শুধু রুটিন কাজ। কারণ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে তফসিল ঘোষণার জন্য সম্ভাব্য সময় ধরা আছে।

খুলনা, গাজীপুর ও সর্বশেষ তিন সিটি (বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট) নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে আমলে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন ইসি। এর মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্রে পড়েছে অস্বাভাবিক ভোট। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।

এদিকে, কয়েক দিন আগে থেকে শুরু হয় ৩০০ সংসদীয় আসনের ভোট কেন্দ্র স্থাপনের কাজ। সেটির প্রাথমিক কাজ শেষে কিছু জায়গায় প্রকাশ পেয়েছে খসড়া ভোট কেন্দ্রের তালিকা। অল্প কিছু দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে এ কর্মযজ্ঞ। একই সঙ্গে চলছে ভুলত্রুটি সংশোধন করে ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণের কাজ। এ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় বছর বছর ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ করা থেকে এবার বিরত থেকেছে কমিশন। ফলে বিদ্যমান তালিকা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন।

গত দশম জাতীয় সংসদের চেয়ে এবার নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ও ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। সে হিসাবে বাড়তি ভোটার ও কেন্দ্রের জন্য নির্বাচন সামগ্রী কেনা হচ্ছে বেশি। এছাড়া গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে ব্যয়ও বাড়ছে। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে ইসি এবার দুইটি নির্বাচনের প্রস্তুতি একসঙ্গে নিচ্ছে। এবার আরপিও সংশোধন না হলেও জাতীয় নির্বাচনের কিছু আসনে ইভিএমে নির্বাচন করতে প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে ইসি। এজন্য থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতিকরণ প্রশিক্ষণ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী নামানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত তফসিলের পর। খবর ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রস্তুতির বিষয়ে কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, বড় পরিসরের স্থানীয় নির্বাচন শেষ। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে যত ধরনের প্রস্তুতির দরকার সবই নেওয়া হচ্ছে। ডিসেম্বরে ভোটগ্রহণের সময় ধরে নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হবে। এর জন্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সামগ্রীসহ সব স্তরের কেনাকেটা শেষ করা হবে। কারণ অক্টোবরে রাজনৈতিক দলসহ নির্বাচনের টুকিটাকি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে কমিশনকে।

সচিব বলেন, এরই মধ্যে ভোট কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা এবং ভোটার তালিকার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তা চূড়ান্ত করার কাজ করছি। পাশাপাশি নির্বাচনের কেনাকাটা সবই করা হচ্ছে। ভোট কর্মকর্তাদের তালিকা তফসিল ঘোষণার আগে করার পরিকল্পনা আছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, বিতর্ক সব সময় থাকবে। কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে এ কাজটি করা হয়। কারণ ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রায় ৪০ হাজারের বেশি ভোট কেন্দ্রের জন্য প্রায় ৬-৭ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা লাগে। এত কিছুর পরও তফসিল ঘোষণার পরে এসব তালিকা করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, সেনাবাহিনীর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে তফসিল ঘোষণার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ এবং আনসার জাতীয় নির্বাচনে মোতায়েন থাকবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পার্থক্য রয়েছে। এ দুইটিকে একসঙ্গে মেলালে চলবে না। জাতীয় নির্বাচনে নানা কমপোনেন্ট কাজ করে। সেখানে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবে। সবার দৃষ্টি এদিকে থাকবে। সারা দেশে একই দিনে ভোট হবে। তারপরও মানুষের মনে সন্দেহ জাগতেই পারে জাতীয় নির্বাচন এ রকম হবে কিনা।

বর্তমান কমিশন এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বড় সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে। এই আয়োজন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সিইসি মহোদয় তো বলেছেনই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ভালো করেছি। আমার কথা হলো আমরা ভালো নির্বাচন করব। সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি আমরা পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি। জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সাবেক আমলা এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আমরা সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছি। সংবিধানের বাইরে আমরা যাব না। সংবিধান ও আইনানুগভাবে আমরা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করব। এর বাইরে আমাদের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেটা করতে গেলে আমাদের শপথ ভঙ্গ হবে, যোগ করেন এই কমিশনার।

এদিকে, নানা বিতর্ক ও সমালোচনার পরও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি। ইসির তথ্য মতে, বিগত পাঁচ বছরে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ভোটার বেড়ে যাওয়ার কারণে এবার ভোট কেন্দ্র বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাও। গড়ে আড়াই হাজারের কাছাকাছি ভোটারের জন্য একটি করে ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। দেশে বর্তমান ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। সে হিসাবে ৪০ হাজারের ওপরে ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ কারণে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার সংখ্যাও হবে গত সংসদ নির্বাচনে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে ৬০ হাজার বেশি।

ভোট কেন্দ্রের নীতিমালায় বলা হয়েছে, গড়ে ৬০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি ও ৫০০ নারী ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ নির্ধারণ করতে হবে। নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভোট কেন্দ্র স্থাপনে যতদূর সম্ভব বিরত থাকতে হবে।

এদিকে, ভোট কেন্দ্র ও ভোটার তালিকার পাশাপাশি নির্বাচন সামগ্রী কেনার জন্য সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। দরপত্র শেষ হয়েছে, এখন শিগগিরই শুরু হবে কেনাকাটা। দেশীয় সামগ্রীর পাশাপাশি বিদেশ থেকেও কিছু নির্বাচন সামগ্রী কিনতে হবে ইসিকে। এসব সামগ্রীর মধ্যে অমোচনীয় কালি ও কলম রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে এবার নির্বাচনী সামগ্রী একটু মানসম্মত কেনা হচ্ছে বলে জানান ইসির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে দেশের প্রায় ৫ উপজেলার নির্বাচন। দুইটি নির্বাচন পর পর হওয়ার কারণে ৬ মাসের ব্যবহার উপযোগী এমন সামগ্রী কেনা হচ্ছে। এর জন্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।

কেনাকাটার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসির উপসচিব মাহফুজা খাতুন বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সামগ্রী কেনা শেষ করা হবে। সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন পর পর হওয়ার কারণে দুইটির সামগ্রী একত্রে কেনা হচ্ছে। ছয় মাস পর্যন্ত নির্ধিদ্বায় এসব সামগ্রী ব্যবহার করা যায়, সেজন্য একটু মানসম্মত জিনিস কেনা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনের জন্য এবার বরাদ্দ ধরা আছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে নির্বাচনের ক্ষণগণনা। ২৮ জানুয়ারি মধ্যে শেষ করতে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

পিডিএসও/হেলাল