সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত

আইন বাস্তবমুখী হলেও সংশোধনী দরকার

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৩৮ | আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ১১:০৮

প্রতীক ইজাজ

মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে দেশে। আইনের নানাদিক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন গণপরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা। আইনের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে একদিকে তারা যেমন এ আইনকে বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী বলে মত দিয়েছেন; তেমনি আইনের কিছু দিক সংশোধনের প্রস্তাবও জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, এই আইনের সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে পরিবহন খাত অনেকটাই শৃঙ্খলায় আনা যাবে। তবে সবাইকে আইনের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাত পরিচালনায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধির পাশাপাশি যাত্রী সাধারণের পক্ষ থেকে নাগরিক প্রতিনিধি রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, অনুমোদন পাওয়া আইনটি এখনো খসড়া। সংসদে আইনটি পাস হবে। সরকারের উচিত হবে সবার সঙ্গে কথা বলে বিভিন্নজনের দেওয়া নানা পরামর্শ নিয়ে অসঙ্গতিগুলো দূর করা। খসড়ায় সংশোধনী আনা।

অবশ্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আইনটি পাস হওয়ার আগে সংসদীয় কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেবে বলে এরই মধ্যে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, আইনটি সংসদীয় কমিটিতে উত্থাপিত হবে, সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। সব স্টেকহোল্ডার ও সবার সঙ্গে আলোচনা করে আইনটি জাতীয় সংসদে পাস করা হবে।

বর্তমান মোটরযান অধ্যাদেশ সংশোধন ও পরিমার্জন করে গত সোমবার বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘সম্পূরক এজেন্ডা’ হিসেবে এ অইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ সংশোধন ও পরিমার্জন করে একটি আইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০১৩ সালে। এরপর গত বছরের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে কিছু পর্যবেক্ষণসহ আইনটি নীতিগত অনুমোদন পায়। আইনে মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন আইনটি মতামতের জন্য পাঠালে তারা অপরাধ ও দণ্ডের বিধান পর্যালোচনা করে খসড়া আইনটি সংযোজন ও পরিমার্জনের জন্য লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়।

অনুমোদিত এই আইনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রাখা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা প্রমাণ হলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান যেমন রাখা হয়েছে; তেমনি তদন্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, এমন প্রমাণ মিললে দণ্ডবিধি ৩০২ অনুযায়ী শাস্তি অর্থাৎ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে। আইনে পরিবহন মালিককেও দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা হয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন ও চালক হেলপারের ওপর হামলা করা যাবে না মর্মে বিধান রয়েছে। পোশাকধারী সরকারি কর্মকর্তার সামনে চালক অপরাধ করলে তাকে গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। রাস্তার কারণে দুর্ঘটনা হলে সেক্ষেত্রে নির্মাণকারী, তদারককারী কর্তৃপক্ষকে দায়ী করার বিধানও রয়েছে আইনে। ফুটপাতে যানবাহন চালালে কিংবা চলন্ত অবস্থায় চালক মোবাইল ফোনে কথা বললেও জেল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের যোগ্যতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা ও বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে হতাহত, চালকের পয়েন্ট কর্তন, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের শর্ত, শহর ভিত্তিক গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ, পরিবহন মালিক-চালকের মধ্যে লিখিত চুক্তি ও পরিবহন মালিকের শাস্তি, বিশেষ ক্ষেত্রে রুট পারমিট থেকে অব্যাহতি, চালক-হেলপারের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি, উল্টোপথে গাড়ি চালালে শাস্তিসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে।

গতকাল আইনের নানাদিক নিয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে দেশের তিনজন গণপরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের কথা হয়। তারা সার্বিক অর্থে আইনকে ‘ভালো’ ও ‘বাস্তবমুখী’ বলে মত দেন। তারা বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য আইন হয়েছে, এটা অনেক বড় অর্জন। কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। সরকার সেগুলো সংশোধন করতে পারবে। সে সুযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মন্ত্রিসভায় আইনটি পাস হয়েছে, এটা অনেক বড় অর্জন। কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। সংশোধনের সুযোগও রয়েছে। তবে আইনের বেশির ভাগই ভালো। এতে পরিবহন খাত ও সড়কে শৃঙ্খলা আসবে। তবে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অরেকটু বিস্তারিতভাবে এলে ভালো হতো। বিশেষ করে বিভিন্ন অপরাধের জন্য যে জরিমানা, সেটা নির্দিষ্ট করা উচিত। তাতে জরিমানা নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ থাকবে না। সড়কের নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামনে আনা উচিত।

এই গণপরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মদ্যপ অবস্থায় বা অসতর্ক অবস্থায় পরিবহন চালনার ফরে মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। সেখানে আমাদের এখানে পাঁচ বছর। এটা বাড়ানো যেতে পারে। আবার হত্যাকাণ্ড প্রমাণের বিষয়েও কিছুটা ফাঁক রয়েছে। কারণ প্রমাণ করা কঠিন। এটা যদি ৩০২ ধারায় যায়, তাহলে চালক শাস্তি থেকে বাদ পড়তে পারেন।

‘তবে আইনটা দরকার ছিল। সেটা হলো। অনেক ভালো দিক আছে। চালক ও মালিকের জরিমানা রাখা হয়েছে, জরিমানাও বাড়ানো হয়েছে। এগুলো অর্জন। বিশ্লেষকরা যেসব বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, সরকার চাইলে সংশোধনীতে এসব আনতে পারে’—বলেও মত দেন অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, এই আইনের সবচেয়ে ভালো দিক হলো শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। চালক ও পরিবহন মালিক উভয় পক্ষকেই জরিমনার আওতায় আনা হয়েছে। এটা আগে ছিল না। আগে কোনো দুর্ঘটনায় মামলা হলে সাধারণত মালিকদের সে মামলা চালাতে হতো। জরিমানাও টাকাও মালিককেই দিতে হতো। এখন চালকদের জন্য পৃথক জরিমানার বিধান করায় চালকরা সতর্ক হবেন। এটা উচিত ছিল করা। সব মিলে আইনটি বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী হয়েছে।

‘তবে কিছু সংশোধনী প্রয়োজন’—উল্লেখ করে এই গণপরিবহন নেতা বলেন, একজন চালকের বিভিন্ন ধরনের যান চালনার জন্য যে লাইসেন্স দেওয়া হয় ও এর জন্য যে পরীক্ষা পদ্ধতি, সেখানে কিছুটা বদলানো দরকার। সহজ করা উচিত। নতুবা হালকা যান থেকে একজন চালককে হেভি যানের লাইসেন্স পেতে অনেক সময় লেগে যায়।

খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, এই আইনের আরেকটি ভালো দিক হলো ট্রাস্টি বোর্ড গঠন। দুর্ঘটনার ফলে যে ক্ষতিপূরণ সেটা তৃতীয় পক্ষ পেত। আহতদের পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন ইন্স্যুরেন্সের টাকা সরাসরি ট্রাস্টি বোর্ডে চলে যাবে। সেখান থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা পাবে। এমনকি এই আইনে ফিটনেসবিহীন গাড়ির জন্য মালিকপক্ষকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয়েছে।

‘তবে সড়কে দুর্ঘটনা যে কেবল চালকের জন্যই হয়, তা নয়। অন্য অনেক কারণ আছে। সবার সেদিকটাও খেয়াল রাখা উচিত। আশা করছি এই আইনের মাধ্যমে পরিবহন ও সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ন্যায়বিচার পাবেন। এই খাতে শৃঙ্খলা আনা যাবে। তবে সবাইকে সচেতন হতে হবে’—মত দেন এই পরিবহন মালিক নেতা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এত দিন অধ্যাদেশ ছিল। সেভাবেই এই খাত চলত। এখন আইন হলো। এটা অবশ্যই ভালো। দীর্ঘদিন একটা আইনের দাবি ছিল আমাদের। সেটা হলো। এটা অবশ্যই সড়কের জন্য ইতিবাচক। এই আইনের বেশকিছু ভালো দিক রয়েছে। চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। চালকের সিটবেল্ট বাঁধা ও নারীপ্রতিবন্ধীসহ সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চালকের সাজা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে—এটাও ইতিবাচক। এটা বাস্তবায়ন হলে চালকের মনোযোগ বাড়বে।

‘তবে মৃত্যু হত্যাকাণ্ড কিনা, তা প্রমাণের জায়গাটায় ফাঁক রয়েছে। এটা প্রমাণ করতে হলে সাক্ষী দরকার। সেটা সম্ভব না। এমনকি এখানে পুলিশকে যে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। এখানে বিআরটিএ’র নেতৃত্বে নাগরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত সংস্থা করা যেতে পারে। এটা ৩০২ ধারায় বিচার করা যাবে না। সুষ্ঠু তদন্ত দরকার। এমনকি পরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি থাকে। সেখানে নাগরিক প্রতিনিধি নেই। এটা অন্তর্ভুক্তি জরুরি। জনগণের অংশগ্রহণ না থাকলে এটা কেবল শ্রমিকদের আইন হবে’—মত দেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

পিডিএসও/হেলাল