ফ্লাইওভারে জলাবদ্ধতা : পাইপ সরু, তাই পানি সরে না

রিপোর্ট তদন্ত কমিটির

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৮, ০৯:৪৩

হাসান ইমন

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে জলাবদ্ধতার জন্য চিকন পাইপ লাগানোকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, হালকা বৃষ্টি হলেই বালু ও বিভিন্ন জিনিসের কণা মিশ্রিত হয়ে পাইপে জমে যায়। আর ফ্লাইওভারের ম্যানহোল না থাকায় বালু ও মাটি দিয়ে ভর্তি হয়ে যায় সরু ছিদ্রের পাইপগুলো। ফলে ফ্লাইওভার থেকে সহজে বৃষ্টির পানি না সরায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এছাড়া এসব পাইপ পরিষ্কারের জন্য জনবল সংকটও রয়েছে। কর্মকর্তাদের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বছরের প্রথম দিকে ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পাইপ চিকন হওয়ায় অনেক জায়গায় পাইপের মুখে বালি ও মাটি জমে থাকায় পানি জমে ছিল। তাই বর্ষার শুরু থেকেই কম-বেশি পানি জমছে ফ্লাইওভারের ওপর। অনেক অংশে পানি নিষ্কাশনের পাইপ অকেজোও হয়ে গেছে। সম্প্রতি বৃষ্টি হওয়ায় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে হাঁটু সমান পানি জমেছে। এতে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি জীবন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়েছে চালকদের।

জলাবদ্ধতার সময় ঘুরে দেখা গেছে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের বেশ কয়েকটি স্থানে পানি জমে শ্যাওলার সৃষ্টি হয়েছে। ওই সময় ফ্লাইওভারটির চৌধুরীপাড়ামুখী কয়েকটি স্থানে বৃষ্টির পানি জমে ছিল। ভাসছিল দুর্গন্ধযুক্ত মলমূত্র-আবর্জনা। এ ফ্লাইওভারের হাতিরঝিল ও সোনারগাঁওমুখী লুপেও পানি জমে থাকতে দেখা যায়। সোনারগাঁওমুখী লুপের শুরু থেকে মধ্যস্থানে পানি জমে কাদা ও শ্যাওলার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে দুর্ভোগের পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় চালকদের। এই দুর্ভোগ নিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিউজ প্রকাশ করলে নজরে আসে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের। পরে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর জাহিদ হোসেনকে প্রধান করে ২৭ মার্চ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। এছাড়া এ কমিটিতে ছিলেন ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী (বর্জ্য) আহম আবদুল্লাহ হারুন, অঞ্চল-২ এর সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন ও অঞ্চল-১ এর সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন। পরে এই কমিটির মনোয়ার হোসেন জুন মাসের ২১ তারিখ ফ্লাইওভার সরেজমিনে ঘুরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে জলজট সৃষ্টি হওয়ার পেছনে কিছু ক্রটি লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে ফ্লাইওভারের দ্বিতীয় তলায় পানি নিষ্কাশনের জন্য লাগানো পাইপ খুবই চিকন। ফলে বালু, কণা জমে থাকায় পানি সরে না। এছাড়া পাইপ লাইনের কানেকটিংগুলোর (সংযোগস্থল) নিচে সবসময় মাটি ও বালু দ্বারা ভরাট থাকে। ফ্লাইওভারের নিচে পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো ফাঁক বা ম্যানহোল না থাকায় বালু, মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে যায়। এছাড়া তৃতীয়তলায় বেজমেন্টে পানি ও বালু পড়ার কোনো ডিস না থাকায় এরকম অচল অবস্থায় হয়ে গেছে।

আর ফ্লাইওভারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য জনবলের সংকট রয়েছে। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় ফ্লাইওভারের পানি যাওয়ার পাইপ মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ক্যাচফিটগুলোয় ঘাস উঠে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি না সরায় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তারা কিছু সুপারিশ দিয়েছেন। এগুলো হলো—ফ্লাইওবারের চিকন পাইপ লাইনগুলো পরিবর্তন করে বড় আকারের পাইপ লাইন স্থাপন করা। আর পানি অপসারণের জন্য মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের মতো নিচের অংশে ফাঁক ও ডিস স্থাপন করা। আর মাঝখানের সংযোগ স্থলে বড় আকারের পাইপ বসানো। এছাড়া ফ্লাইওভারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা পরিষ্কারের জন্য জনবল নিয়োগ করা।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথমত মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার এখনো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেনি। ফলে সিটি করপোরেশন চাইলেও কোনো কাজ করতে পারে না। আর দ্বিতীয়ত মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে ফ্লাইওভারে পানি জমে। যেহেতু এখনো হস্তান্তর করেনি, সেজন্য আমরা নিজেরাই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত কমিটি সমস্যাগুলো তুলে ধরে ফ্লাইওভার প্রকল্প পরিচালকের কাছে হস্তান্তর করব। যেন তারা এই সমস্যাগুলো সমাধান করে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। উদ্বোধনের পর মাসাধিককাল পার হলেও নানা অজুহাতে কোনো সংস্থাই এই স্থাপনাটির দায়িত্ব নেয়নি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিন তলাবিশিষ্ট চার লেনের এই ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ হাজার ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা।

ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ করা হয়েছে তিন ভাগে। প্রথম অংশ সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত। এই অংশটি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করেন। এই ফ্লাইওভারটির দ্বিতীয় অংশ হলো বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক পর্যন্ত। এই অংশটি যান চলাচলের জন্য গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর উন্মুক্ত করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফ্লাইওভারটির তৃতীয় অংশ শান্তিনগর-মালিবাগ-কাকরাইল-রাজারবাগ অংশ গত ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেন।

পিডিএসও/হেলাল