আনসারদের কাজ বাড়লেও সুযোগ-সুবিধা কম

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৮, ০৮:৫৯ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৮, ১৩:০৬

জুবায়ের চৌধুরী

ব্যাটালিয়ন আনসাররা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও সেসব থেকে বঞ্চিত সাধারণ আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা সদস্যরা। বেতন নেই, তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন দৈনিক মজুরিতে। ৩ বছর পর পর বেতন এবং রেশন ছাড়া ৬ থেকে ৮ মাসের লম্বা কর্ম বিরতিতে যেতে হয়। তখন লোকলজ্জায় অন্য কোনো কাজও করতে পারেন না। এমন নানা বিড়ম্বনা আর অনিশ্চয়তায় চলছে তাদের জীবন। অথচ নিজেদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও এই বিশাল বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ মানুষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন এবং বাড়তি দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে। স্বেচ্ছাসেবী আনসার বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতোই একটি বাহিনী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে। তাদের দায়িত্ব বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি।

ব্যাটালিয়ন আনসার পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। আর সাধারণ আনসার পুলিশের থানা, ট্রাফিক বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা রক্ষার কাজে থাকে। গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী কাজ করে বিশেষ করে নির্বাচনের সময়। বাহিনীর সদস্যদের সামরিকসহ দেওয়া হয় জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ। ক্ষেত্র বিশেষে তারা নিরস্ত্র আবার সশস্ত্র হয়েও কাজ করে থাকে। আর তাই আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করা সাধারণ আনসারদের সদস্যরা তাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যাশা করেন অবসর ভাতার।

সৈনিক থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্লাটুন কমান্ডার হয়েছেন আমজাদ হোসেন। চাকরি এখন শেষের পথে। নেই অবসর ভাতা, রেশনের সুবিধা। অবসরে গিয়ে কী করবেন জানেন না তিনি। চারদিকে অন্ধকার দেখছেন। আমজাদ হোসেনের মতো অন্যান্য সাধারণ আনসারদেরও একই অনিশ্চয়তা। একে তো বেতন সামান্য, তার ওপর ৩ বছর পর ৬ থেকে ৮ মাসের জন্য কর্মবিরতিতে বাসায় বসে থেকে কিছুই করতে পারেন না। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সেসব জায়গায় নেই মানসম্মত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। তাই ভালো চাকরির খোঁজে থাকেন সবাই। ২০০২ সালে আনসারের চাকরি ছেড়ে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ নিয়েছেন বজলুর রশিদ। তিনি চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে অল্প বেতন ও নানা হয়রানির অভিযোগ তুললেন। সাধারণ আনসারদের অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু ব্যাটালিয়ন আনসারদের তেমন কোনো অসুবিধা নেই। অভিযোগ শুধু সিটি ডিউটির টাকা নিয়ে। তাদের ইউনিট গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকায় ঢাকায় দায়িত্ব পালনকারীরা তাদের পাওনা টাকা পান না ঠিকমতো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ আছে।

অবহেলিত আনসার সদস্যরা পদে পদে বঞ্চিত। আর তাই টাকা কামাতে অসৎ পথ বেছে নিচ্ছেন তারা। সরেজমিনে পান্থপথে গতকাল দেখা গেল, রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা গুনতে গুনতে চলে যান ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য। অথচ চাঁদার বিষয়ে কথা বলতে গেলে তা অস্বীকার করেন। অবশ্য খানিক পরে স্বীকারও করেন। এরপর এক নাগাড়ে বলতে থাকেন জীবন-সংসার আর সামান্য বেতনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে চলা জীবনের কঠিন গল্প। এসব কারণে আনসারদের সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে সাধারণ মানুষের মনে।

আনসারে অবহেলিত নারী : আনসার বাহিনীতে দায়িত্ব পালনে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই নারী সদস্যরা। বাহিনীতে ক্রমান্বয়ে নারীদের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। তবে পুরুষদের থেকে সাধারণ নারী আনসারদের সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। চাকরিতে যোগ দিতে প্রশিক্ষণের পর অপেক্ষায় থাকতে হয় বছরের পর বছর। ময়মনসিংহের মেয়ে মৌসুমী আক্তার। দুই চোখ ভরা স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সংসারে সহযোগিতা করতে ২০১৪ সালে আনসারের ট্রেনিং নেয় মৌসুমি। এখন বাহিনীতে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। সংসারের হাল ধরেছেন অনেকটা। তবে স্বপ্ন ভুলেননি, স্বপ্ন পূরণে সারা দিন কাজের পরও চালিয়ে যাচ্ছেন লেখাপড়া।

মৌসুমির মতো এই বাহিনীতে আসা প্রতিটি নারীর জীবনের গল্প একই রকম। নিম্নআয়ের পরিবার থেকে এসেছেন তারা। কেউ এসেছেন পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে সংসারের হাল ধরতে, কেউ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাবলম্বী হতে। তবে প্রশিক্ষণের পর দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং চাকরির ৩ বছর পর লম্ব^া সময় বেকারত্ব এই বাহিনীর প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন নারী সদস্যরা। তাই আরো ভালো কাজের চেষ্টায় থাকেন তারা। এদিকে, সাধারণ আনসারের প্লাটুন কমান্ডার শহীদুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাধারণ নারী আনসারদের চাহিদা কম থাকায় তাদের নিয়োগে খানিকটা বিলম্ব হয়।

৬১ লাখের বিশাল পরিবার : এক সময় নিরস্ত্র বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল ৭০ বছরের পুরনো আনসার। এখন নিরস্ত্র এবং সশস্ত্র—দুইভাবেই কাজ করছে বাহিনী। বেড়েছে কাজের পরিধি, পাল্টেছে গঠন কাঠামো, পোশাক, বড় হয়েছে বাহিনী, বেড়েছে সদস্য সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে দায়িত্ব, কাজের ধরনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। নানা ধরনের ৬১ লাখ সদস্য নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। তিন ধরনের সদস্য আছে এই বাহিনীতে, যেমন—সাধারণ আনসার, ব্যাটালিয়ন আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা সদস্য। দুইটি নারী ব্যাটালিয়নসহ মোট ব্যাটালিয়ন আছে ৩৯টি। ২৪টি ব্যাটালিয়ন গুরত্বপূর্ণ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কাজ করে থাকে। দেশজুড়ে বিস্তৃৃত এই বাহিনীর কাজ।

আনসার বাহিনীর নানা দিক নিয়ে উঠে আসা বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শেখ পাশা হাবিব উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয় বেশ কয়েকবার। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে তিনিসহ আনসার বাহিনীর কোনো কর্মকর্তাই কথা বলতে চান না। ফলে বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চিন্তা, ভাবনা ও পরিকল্পনা অজানা থেকে গেছে।

পিডিএসও/হেলাল