ঘাট ইজারা নিয়ে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৮, ০৮:৫৫ | আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৮, ১১:০২

গাজী শাহনেওয়াজ

সারাদেশের নদী ও বন্দরের ঘাট ইজারা নিয়ে চলছে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব। দীর্ঘকালের চাপা এ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। প্রেস্টিস ইস্যুর কারণে পক্ষগুলো এখন নিজ নিজ আস্থা থেকে সরে আসতে পারছে না।

সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), সড়ক ও যোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা) স্তর রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, ঘাট ইজারায় অন্যদের হস্তক্ষেপ এখতিয়ারবহির্ভূত। তাদের যুক্তি, পন্টুন স্থাপনসহ জেটির নির্মাণ, লঞ্চঘাটে যাত্রী ছাউনি তৈরি ও পন্টুনের উভয় পাশে ৫০০ গজ তীরভূমি নির্মাণের কাজও করে থাকে সংস্থাটি। তাই ইজারা দেওয়া ও রাজস্ব আদায়ের এখতিয়ার তাদের। তবে অন্যপক্ষ তা মানতে নারাজ। ফলে স্টেশনের ইজারা ও শুল্ক আদায়ে বর্তমানে দ্বৈত প্রশাসনের রাজত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে তিন পক্ষের মধ্যে রশি টানাটানি। এই দ্বন্দ্বে নদীর ঘাট ইজারা বন্ধ থাকার কারণে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজ্জাম্মেল হোসেন বলেন, সারাদেশের নদী ও বন্দরের ঘাটগুলোতে ইজারা প্রদান নিয়ে সরকারের তিন অঙ্গের মধ্যে এক ধরনের দ্বৈত প্রশাসনিক জটিলতা চলছে। তিনি বলেন, নদী ও ঘাটগুলোতে যান চলাচল ও যাত্রীসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে পন্টুন কিংবা যাত্রী ছাউনি তৈরি করে থাকে বিআইডব্লিউটিএ। অন্য কোনো পক্ষ এসব কাজ করে না। কিন্তু এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে কিছু সংস্থা আমাদের পাশাপাশি ঘাটগুলোর ইজারা দিয়ে সংঘাতে জড়াচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, আন্তমন্ত্রণালয় সভা করে বিরোধ নিষ্পত্তি করার। ইতোমধ্যে চিলমারী নদীবন্দরের লঞ্চঘাটটি বিরোধ মীমাংসা শেষে যৌথভাবে জরিপকাজ শুরু হয়েছে, বলেন টিএর এই চেয়ারম্যান।

নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সারা দেশের ঘাট ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্থানীয় সরকারের আওতাধীন পাগলা-পানগাঁও ফেরিঘাটটি গত এক যুগ আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ ইজারা দেওয়া থেকে শুরু করে রাজন্ব আদায় সবকিছুর দেখভাল করত। কিন্তু ২০০৪ সালে ঢাকা নদীবন্দরের সীমানা বর্ধিতকরণ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে যায় ঘাটটি। তখন থেকে সংস্থাটি ঘাট ইজারা দেওয়া শুরু করে। পাশাপাশি জোর করে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ইজারা দেওয়া অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে দ্বৈত প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলা-পাল্টা মামলা শুরু হয়। যুক্তিতর্ক ও শুনানির পর মামলার রায় বিআইডব্লিউটিএর পক্ষে আসে। সেই থেকে টানা গত তিন বছর এককভাবে ইজারা প্রদান করে এ সংস্থা।

পুরনো বিরোধ নতুন করে ফিরে আসে সম্প্রতি অবৈধভাবে জেলা পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ ইজারা প্রদানে নিজেদের যুক্ত করায়। বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটটি ইজারার জন্য বিআইডব্লিউটিএ দরপত্র আহ্বান করলে তা চ্যালেঞ্জ করে রিট করে স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ ওই বিভাগ। পরে রিটের কার্যক্রম স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ প্রদান করেন আদালত। এই পরিস্থিতিতে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিআইডব্লিউটিএ দরপত্র কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে ঘাট ইজারা বন্ধ থাকায় সরকার প্রায় ৩০ লাখ টাকা চলতি অর্থবছরে এই ঘাট থেকে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে।

জেলা পরিষদ, ঢাকার আওতাধীন শ্যামলাসী-কলাতিয়াপাড়া ফেরিঘাটটির চিত্রও একই। এ ঘাট ঢাকা নদীবন্দরের সীমানার অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বিআইডব্লিউটিএর অনুরোধ উপেক্ষা করে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ জোর করে ইজারা দিচ্ছে। কাঠপট্টি-কদমতলী-চরসন্তোষপুর আন্তজেলা খেয়াঘাটের ক্ষেত্রেও হুবহু ঘটনা ঘটেছে। এই খেয়া ঘাটটির উত্তরপাড় মুন্সীগঞ্জ জেলায় এবং দক্ষিণপাড় নারায়ণগঞ্জ জেলার সীমানায় অবস্থিত। প্রতিদিন ইঞ্জিতচালিত নৌকার মাধ্যমে খেয়াঘাটটি দিয়ে উভয়পাড়ে কয়েক হাজার যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের দফতর থেকে এ ঘাটটির ইজারা দেওয়া হচ্ছে। বৈধ কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ এখানে দর্শকের ভূমিকায়। কিশোরগঞ্জের চামড়া (চামটা) লঞ্চঘাটটি ১৯৮৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর আরডি ২১ প্রকল্পের মাধ্যমে উক্ত ঘাটে বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য একতরফা বিআইডব্লিউটিএর লিজ বাতিল করেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক। পুনরায় ঘাটটি ফেরত পেতে দেন-দরবার চালাতে থাকে সংস্থাটি। সর্বশেষ ২০১৪ সালে জেলা প্রশাসককে পত্র দিলেও প্রায় পৌনে ৪ বছরে পত্রের জবাব পায়নি বিআইডব্লিউটিএ। ফলে অনিষ্পন্ন রয়েছে এ ঘাটের বিরোধ।

বিআইডব্লিউটিএর পরিচালিত ডাবঘাট ফেরিঘাট (নড়াইল কাছারীঘাট)। ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ইজারা দিয়ে আসে সংস্থাটি। হঠাৎ গত ২০১০ সালে খুলনা সিটি করপোরেশন এ ঘাটের ইজারা দেওয়া শুরু করলে বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। দুই সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে বর্তমানে এ ঘাটটির ইজারা বন্ধ রয়েছে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ একসরা লঞ্চঘাটটি ইজারা দিত। কিন্তু সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিএ ২০১৪ সালে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি টার্মিনাল পন্টুনসহ জেটি স্থাপন করে ইজারা দেওয়া শুরু করে। বিআইডব্লিউটিএর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনও তাদের ইজারা কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে সরকারের দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে বিরোধ বাধে। এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে এ ঘাট। ফলে প্রতি বছর বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

শুধু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা ও সাতক্ষীরা নয়, সারাদেশের নদী-ঘাটগুলোর চিত্র একই। এর মধ্যে বিভাগীয় কমিশন কার্যালয়, চট্টগ্রামের ইলিশা লঞ্চঘাট, চাঁদপুর পৌরসভার নতুন বাজার গুদারাঘাট, ৫নং ফেরিঘাট, কয়লাঘাট ও চৌধুরীঘাট, শরীয়তপুরের মঙ্গলমাঝি-মাঝিকান্দি-পূর্বনাওডোবা লঞ্চঘাট এবং গাইবান্ধার বালাসী ঘাট এ তালিকায় রয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল