রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

সংকটের সমাধান মিলছে না

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ০৮:৫৯

প্রতীক ইজাজ

মিয়ানমার মুখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এর আগে দুই দেশের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী গত ২৩ জানুয়ারি থেকেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল দেশটি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওইদিন প্রথম দফায় ৭৫০ জন মুসলমান ও ৫০৮ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় দেশটি। এজন্য সে দেশের সরকার তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথম দলে তাদের রাখতে মিয়ানমার বাংলাদেশকে অনুরোধও করেছে। এমনকি এই চুক্তি বাস্তবায়নে এসব রোহিঙ্গাদের কীভাবে ফেরত পাঠানো হবে, তা চূড়ান্ত করে গত ১৬ জানুয়ারি আরেকটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ। এই ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সম্মত হওয়ার সময় থেকে দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার।

কিন্তু সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো বলছে, কেবল বিশ্বকে দেখানোর জন্যই চুক্তির দুই মাস পূর্ণ হওয়ার দিন নামমাত্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া শুরু করতে চায় মিয়ানমার। কেননা কীভাবে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই করেছে তা স্পষ্ট করছে না দেশটি। এর আগে মিয়ানমার একতরফাভাবে হিন্দু রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তাতে সম্মত না হয়ে এদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিবারভিত্তিক তালিকা তৈরি করে নেপিডোকে দেয়। মিয়ানমারও সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেয়।

এই ঘটনার ঠিক এক মাসের মাথায় এ মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের অনিচ্ছা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কথা বলে ১ মার্চ সকালে হঠাৎ করেই বাংলাদেশ অংশের বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও গুলির ঘটনা ঘটায়। এতে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। সংকট সমাধানে দুই দেশের মধ্যে পতাকা বৈঠকও হয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। বরং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির পোশাকে সেনা টহল এখনো অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার। এর জবাবে বাড়তি সদস্য মোতায়েন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। এছাড়া সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য মিয়ানমারের পক্ষ থেকে হুমকি ও চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

এমনকি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন থেকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে জাতিগত নিধনের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো ‘গণহত্যা’ অস্বীকার করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করছে মিয়ানমার। গত বৃহস্পতিবার রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়েছে মিয়ানমার। অভিযোগের বিপরীতে সুস্পষ্ট প্রমাণ হাজির করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন। অথচ প্রমাণ হাজির করতে বললেও ঘটনা অনুসন্ধানে এখনও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়নি সেখানকার ডি-ফ্যাক্টো সরকার। উল্টো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যার সব প্রমাণ মুছে ফেলতে চাচ্ছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের একটি গণকবরে বুলডোজার চালিয়ে তা নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। যদিও স্যাটেলাইট ইমেজ এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে রাখাইনে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার আলামত পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) নিজস্ব অনুসন্ধানে মিয়ানমারে অন্যান্য গণকবরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স দাবি করছে, দেশটির রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর গণহত্যার যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।

এমনকি এখনো রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য মতে, গত সপ্তাহেও শতাধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়ায় এসেছে। এর ফলে দিনে দিনে রোহিঙ্গা সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একইভাবে সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করছে বিভিন্ন মহল। মিয়ানমার আদৌ কি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়; নাকি সংকট সমাধানে আলোচনার প্রস্তাব নিছক লোক দেখানো—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন তারা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নানা চাপ ও নিন্দা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো দেশটির উদ্ধত আচরণ প্রকাশ করছে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মিয়ানমারের এমন আচরণের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের সম্মতি লোক দেখানো বলে মনে হচ্ছে।

তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সম্ভব হয়নি। কারণ আমরা স্বেচ্ছায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে চাই। আশা করছি আমরা নেপিডোকে যে তালিকা দিয়েছি, সে অনুযায়ী প্রত্যাবাসন শুরু হবে। আমরা চেষ্টা করছি কোনো ধরনের বিরোধ বা বিতর্ক ছাড়াই প্রত্যাবাসনে যেতে।

অবশ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত ৬ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে একটি চুক্তি করেছে; যদিও আমরা এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। দুইটি কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে না; একটি হলো মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত এই শরণার্থীদের ফেরত নেবে না; দ্বিতীয়টি হলো, রাখাইনে অনিশ্চিত জীবনে ফেরত যেতে চাইবে না রোহিঙ্গারাও। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে গত বছরের আগস্টের পর এই পর্যন্ত ৬ লাখের বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আগে থেকে বাংলাদেশে রয়েছে ৪ লাখের মতো। বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে মিয়ানমার সরকার এই দফায় আসা রোহিঙ্গাদের নিতে রাজি হলেও প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে সংকট তীব্র হচ্ছে। চরম দুর্দশাগ্রস্ত এই উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশের জরুরিভিত্তিতে সহায়তা দরকার। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় আগামী ১০ মাসে আরো ৯৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা প্রয়োজন। শরণার্থী রোহিঙ্গা ও কক্সবাজারের যেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা অবস্থান করছেন সেখানকার স্থানীয় জনগণের সহায়তার জন্য এই অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার।

এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিশেষ করে সীমান্তে সেনা মোতায়েন ও ভারী অস্ত্রের উপস্থিতি প্রতিবেশী সুলভ তো নয়ই, বরং উসকানিমূলক। বাংলাদেশ সীমান্তে সেনা শক্তি প্রদর্শন করে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে সতর্ক করা ছাড়াও বাংলাদেশের উচিত তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া। জাতিসংঘসহ মিয়ানমারকে সমর্থনকারী দেশগুলোর কাছে বিষয়গুলো আরো জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। এসব দেশের প্রতিটির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের স্বার্থ সব সময়ের জন্য উপেক্ষা করবে, এমন মনে হয় না। রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়া সংলগ্ন অঞ্চলের ভূকৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পরিষ্কার হয়ে উঠছে। এর সুযোগ বাংলাদেশ কতখানি নিতে পারবে, তা নির্ভর করবে সুচিন্তিত এবং জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

পিডিএসও/হেলাল