৫ সিটি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত শিগগিরই

*প্রস্তুতি নিতে কর্মকর্তাদের ইসির নির্দেশ *কেনা হচ্ছে নির্বাচনের সামগ্রী *সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুরু

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:১৬

গাজী শাহনেওয়াজ

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই দেশের পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এগুলো হলো—গাজীপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী। এসব নির্বাচন অনুষ্ঠানে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসবে ইসি। এসব নির্বাচন একদিনে নাকি একাধিক দিনে হবেবৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।

এ উপলক্ষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কমিশনের মাসিক সমন্বয় সভায় নির্বাচন উপযোগী প্রত্যেকটি এলাকার নির্বাচন কর্মকর্তাদের নির্বাচনসংক্রান্ত যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এতে ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত করা এবং নির্বাচনী এলাকার ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরআগে নির্বাচনের সামগ্রী কেনার কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচনের ব্রাসসিল ও মার্কিং সিল কেনা হচ্ছে। কারণ, পাঁচ সিটি করপোরেশনে আগামী বছরের মাঝামাঝি ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনগুলোর তথ্য সংগ্রহ করছে ইসি সচিবালয়। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এরআগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন নিয়ে সরব ছিল রাজনীতি। রংপুর সিটি করপোরেশনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) উপনির্বাচন নিয়ে আশা জেগেছিল মানুষের মধ্যে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং উত্তর ও দক্ষিণে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই দেখা দেওয়া আইনি জটিলতার সমাধান না করায় আদালত তিন মাসের জন্য এই নির্বাচন স্থগিত করেছেন।

ফলে জাতীয় নির্বাচনের আগে এই পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। রাজনীতিতেও ঘুরপাক খাচ্ছে নানা প্রশ্ন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মধ্যে এ নির্বাচন নিয়ে নতুন ভাবনার উদ্রেক হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, এই নির্বাচনগুলোতে জয় না পেলে জাতীয় নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে কিছুটা বেগ পেতে হতে পারে তাদের। আবার বিএনপি মনে করছে, বিগত সময়ে তাদের দলীয় মেয়ররা মামলা-মোকদ্দমার কারণে কাজ করতে না পারায় ভোটারদের এক ধরনের অনাস্থা আসতে পারে তাদের ওপর। সে ক্ষেত্রে জয় পেতে বেগ পেতে হতে পারে তাদেরও।

তবে দুই দলেই এসব নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে। পাঁচ সিটি করপোরেশনে সংশ্লিষ্ট জেলা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনেক সময় বাকি থাকলেও সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা সরব হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তারা নিজেদের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। নির্বাচন অফিসগুলোয়ও খোঁজখবর নিচ্ছেন। কেউ কেউ নির্বাচনের যোগ্যতা-অযোগ্যতার শর্ত, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী করণীয়, তা নির্বাচন অফিস থেকে জেনে নিচ্ছেন। এমনকি পুরনো মনোনয়নপত্রের ফরমও নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করছেন কেউ কেউ। তারা জানান, সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় পাঁচ সিটিতে নির্বাচনী আমেজ বইতে শুরু করেছে।

পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিষয়ে ইসির অবস্থান জানতে চাওয়া হলে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, পাঁচ সিটি নির্বাচনের বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে, একদিনে নাকি ভিন্ন ভিন্ন তারিখে নির্বাচন হবে কমিশনারদের মতামত নিয়ে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নির্বাচন উপযোগী সব নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সিটিতে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র কোন কোন প্রতিষ্ঠানে হতে পারে এবং ওইসব প্রতিষ্ঠানের কী অবস্থা, তা খোঁজখবর নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনে ভোটার হালনাগাদ ও ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুতের বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোস্তফা ফারুক বলেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি কমিশনের মাসিক সমন্বয় সভায় নির্বাচন উপযোগী সব নির্বাচনের প্রাথমিক সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত করা এবং সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের কাজকে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ রয়েছে কমিশনের। তিনি আরো বলেন, যেখানে নির্বাচনের ঘোষণা কিংবা নির্দেশনা কমিশন থেকে দেওয়া হবে যাতে তাৎক্ষণিক সব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, সে নির্দেশনাও আগাম দিয়ে রেখেছে কমিশন।

সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করপোরেশনের মেয়াদ, পরীক্ষার সময়সূচি ও অনুকূল আবহাওয়ার বিষয় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চলতি মাসে (ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী এপ্রিলের শেষদিকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়ে জুন পর্যন্ত চলতে পারে।

ইসির তথ্যমতে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়াদ আগামী বছরের ৪ সেপ্টেম্বর, ওই বছরের ৮ সেপ্টম্বর সিলেট, ২৫ সেপ্টম্বর খুলনা, ৫ অক্টোবর রাজশাহী ও ২৩ অক্টোবর বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হবে। আগামী বছরের ৮ মার্চ গাজীপুর, ১৩ মার্চ সিলেট, ৩০ মার্চ খুলনা, ৯ এপ্রিল রাজশাহী ও ২৭ এপ্রিল বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কাউন্টডাউন বা ক্ষণগণনা শুরু হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব সিটিকে ভোট গ্রহণ করতে হবে।

ইসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালের ১৫ জুন বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনে একই দিন ভোট হয়েছিল। কিন্তু ওইসব সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সভার দিন থেকে করপোরেশনের মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়ায় কমিশন এক দিনে কিংবা ধাপে ধাপে এসব সিটিতে ভোট নেওয়ার চিন্তা করছে।

নির্বাচনের মালামাল সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে উপসচিব মাহফুজা আক্তার বলেন, পাঁচ সিটির নির্বাচন কোন তারিখে অনুষ্ঠিত হবে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে, এসব নির্বাচনের যেসব নির্বাচনীসামগ্রী কেনা প্রয়োজন কমিশনের নির্দেশনানুযায়ী, সেটা করা হচ্ছে। নির্বাচনী সামগ্রীর মধ্যে ব্রাসসিল ও মাকিং সিল রয়েছে। এছাড়া এ নির্বাচনের অন্যান্য নির্বাচন সামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে। আর শীত মৌসুম এড়িয়ে জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনের মালামাল কেনার নিদের্শনা রয়েছে। আগামী এপ্রিলের পর এ দুটি নির্বাচনের সামগ্রী কেনার ধুম শুরু হবে। কারণ সংসদ নির্বাচনের পর পরই সারাদেশে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

পিডিএসও/হেলাল