এনআইডির তথ্যভাণ্ডার ইসির জন্য মরণফাঁদ

*সেবা বন্ধ হতে পারে যেকোনো সময় *ঝুঁকিতে পড়তে পারে সেবা নেওয়া ৮২ প্রতিষ্ঠান *ডাটা সংযোজন হচ্ছে না বিসিসির ডাটাবেজে

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৪৫

গাজী শাহনেওয়াজ

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার এখন মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য। এর জন্য টাইগার আইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে দায়ী করা হচ্ছে। ফলে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভোটার নাগরিকের তথ্যসংবলিত ডাটা সার্ভারটি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্বাভাবিক চাপের কারণে এনআইডির এক্সাডাটা মেশিনের আটটি ডাটাবেজ সার্ভারের মধ্যে তিনটিতে বিপজ্জনক সতর্কতা দিচ্ছে। এছাড়া ১৪টি স্টোরেজ সার্ভারের ৫৬টি ফ্লাশ ড্রাইভের মধ্যে নয়টি বিকল হয়ে গেছে। ফলে ডাটাবেজের সাফল্য (পারফরম্যান্স) ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি গত ১ জানুয়ারি হঠাৎ স্টোরেজ সার্ভার বন্ধ হয়ে যায়। মুছে যায় সব ভোটারের তথ্য, যা ১২ ঘণ্টা পর ব্যাকআপ ডাটাবেজ থেকে উদ্ধার করা হয়।

এ লক্ষ্যে গত ১৮ জানুয়ারি কমিশনের এক সভায় এ নিয়ে আলোচনার পর আজ সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো নুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৭-০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের নাগরিকদের ডেমোগ্রোফিক এবং বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ করা হয়। পরে ২০০৯ সালে প্রায় ৫১৮ উপজেলার ভোটারদের ডাটা একত্রিত করে ওরাকল ডাটাবেজের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হয়। ২০১০ সাল থেকে ওরাকল এক্সাডাটা মেশিনের মাধ্যমে যাবতীয় ডাটা প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

এর জন্য পারপ (পিইআরপি) প্রকল্পের অধীনে নয় কোটি নাগরিকের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী ওরাকল এক্সাডাটা (এক্স২-২)-এর একটি ফুল র‌্যাক এবং আরেকটি হার্ফ র‌্যাক কেনা হয়। ফুল র‌্যাকটি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)তে এবং হার্ফ র‌্যাকটি ইসির ডাটা সেন্টারে (ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নবম তলায়) স্থাপন করা হয়। বিসিসির ডাটা সেন্টার ডিআরএস ডাটা সিস্টেমে এবং ইসিরটি ডিসির ডাটাবেজ পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে বিসিসির ডাটাবেজের গুদাম (স্টোরেজ) সম্পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে, যার কারণে এখানে নতুন কোনো ডাটা সংযোজন করা যাচ্ছে না। এমনকি পুরনো ডাটার কোনো ধরনের আপডেট কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ইসির ওরাকল এক্সাডাটা মেশিনেই এনআইডি সিস্টেমের সব কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ভোটার তালিকা প্রস্তুতেও ব্যবহার হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ওরাকল এক্সাডাটা মেশিনের সাপোর্ট রিনিউ হয়নি। ফলে গত ২০১৬ সালের জুনের পর ডাটাবেজের কোনো নিরাপত্তা প্যাচ আপডেট হয়নি। এমনকি এক্সাডাটা মেশিনের কোনো স্পেয়ার পার্টস মজুদ নেই। ফলে এক্সাডাটা সিস্টেমের কোনো হার্ডওয়্যার বিকল হয়ে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে এনআইডির সব কার্যক্রম। এছাড়া দেশব্যাপী ৮২ প্রতিষ্ঠান এনআইডির ডাটার তথ্য সেবা নিচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

আর সংযোগ বিচ্ছিন্ন (ডিসি) এবং সরাসরি নিবন্ধন প্রক্রিয়া (ডিআরএস) উভয় অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম (এএফআইএস) সাপোর্ট সার্ভিস মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ডিসির জন্য কেনা এএফআইএসএ ১০০ মিলিয়ন ভোটারের জন্য লাইসেন্স থাকলেও বর্তমান ডাটাবেজের আকার ১০৪ মিলিয়ন। ফলে বর্তমানে এএফআইএস শুধুমাত্র ভোটারের ৪ আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে কাজ করায় ১০ আঙ্গুল ও চোখের আইরিশ নেওয়া হলেও সেগুলো ক্রস ম্যাচিং করা যাচ্ছে না। ফলে নতুন ভোটারের ক্ষেত্রে দ্বৈত ভোটার শনাক্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে ভোটার নাগরিকদের তথ্য রক্ষার্থে সফটওয়্যার আপডেট এবং হার্ডওয়্যার ও সফরটওয়্যার সাপোর্ট সার্ভিস চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা দরকার বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কমিশনের ডিসি ও ডিআরএসর জন্য অতিপ্রয়োজনীয় দুটি নতুন আপগ্রেডেড ডাটাবেজ সিস্টেম কেনা এবং ওরাকল, এএফআইএস ও বিভিআরএসর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছে এনআইডি কর্তৃপক্ষ। এর জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থাৎ আগামী ৩ মাসের জন্য ১৩৫ কোটি, মধ্যমেয়াদি আগামী ৬ মাসের জন্য ১৫৩ কোটি এবং দীর্ঘমেয়াদি আগামী ১ বছরের জন্য ৭৩ কোটি টাকাসহ মোট ৩৭২ টাকা বরাদ্দের সুপারিশ জানিয়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে এনআইডির কার্যক্রমকে সচল রাখতে আজ সিইসির জন্য বৈঠকে বসছে এনআইডির ওরাকল এক্সাডাটা মেশিন কর্তৃপক্ষ।

পিডিএসও/হেলাল