দেশজুড়ে আলোচনা

কেমন হবে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:০০ | আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৪৮

প্রতীক ইজাজ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে আবারও নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুটি সামনে চলে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভোটের আগে সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। এমন একটি সরকারের দাবি ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিও করে আসছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো রূপরেখা তুলে ধরেননি। এখন পর্যন্ত বিএনপিও এ ধরনের রূপরেখা দেয়নি। আবার সংবিধানেও নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। ফলে কেমন হবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা—এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশে।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এমনও বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদি তাই হয়, তাহলে শেখ হাসিনার অধীনে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই ভোট হওয়ার কথা। এ নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। কেননা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ বিএনপি। আবার একতরফা নির্বাচনী বিতর্ক এড়াতে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রাসঙ্গিকতাও নানাভাবে এসেছে নানা মহল থেকে। ফলে সংবিধানের মধ্যে থেকেই কিভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা যেতে পারে—এ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।

শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরপরই নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে রাজনীতি। এতদিন এ নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা হলেও সরকার প্রধান হিসেবে গতকালই প্রথম নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে স্পষ্ট করে বললেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছেন সবাই। সংবিধানের নানা অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে নানা মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি। চিন্তায় পড়েছে বিএনপিও। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনেরই বা ভূমিকা কী হবে—তা নিয়েও এক ধরনের দ্বিধায় পড়েছে কমিশনও।

এ নিয়ে আবারও তর্ক-বিতর্কে জড়িয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা। ভাষণের পর সে রাতেই এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। পরদিন গতকাল নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে সংলাপ ডাকার আহ্বান জানায় দলটি। এমনকি এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও মত দেন তিনি।

বিএনপির সংলাপের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, নির্বাচন বিএনপির অধিকার। এখানে বসাবসির কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি এমনও বলেন, এখন নির্বাচনের ব্যাপারে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। নির্বাচনের জন্য সংবিধানে যে পথ রয়েছে, সেই অনুযায়ী, নির্বাচন হবে। সেই পথ নিয়ে সংলাপ করতে হবে কেন?’

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও। তার মন্তব্য, নির্বাচনকালীন সরকার বলে সংবিধানে কিছু নেই। পরদিন এর জবাবে আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদের বলেন, ব্যারিস্টার মওদুদ বহুরূপী। মওদুদ সম্পর্কে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো। তিনি আইনের মুখোশ পরে বেআইনি কথা বলেন। সংবিধানে সবই আছে। সংবিধান আরেকবার ভালোভাবে দেখবেন।

কেমন হতে পারে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা—জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কি না সবকিছুই সংবিধানের ১১৮-১২৬ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে। এক কথায় বলতে গেলে, নির্বাচন করবে ইসি, তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে সরকার। সহযোগিতার বিষয়টি সরকারের দায়িত্ব নয়, সাংবিধানিক কর্তব্য। নির্বাচনের সময় সরকার ছোট হবে, ইসি বড় হবে। আর এসব যদি আলোচনা করে ঠিক করতে পারি, তাহলে সংকট হবে না। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হলো, না হলো—তাও বিবেচনায় আসবে না। এজন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট সবারই উচিত ইসিকে সহযোগিতা করা।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলেছেন, তার রূপরেখা কেমন হতে পারে—এ নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রতিদিনের সংবাদ। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রূপরেখা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগ সূত্রমতে, দশম সংসদ নির্বাচনের সময় সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ছোট সরকার গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালের নভেম্বরে গঠিত নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় ২১ জন মন্ত্রী ও সাতজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এবার কেমন হবে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। তাছাড়া বিএনপি এখন সংসদে নেই। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তারা অংশ নেয়নি। শেখ হাসিনা বলে আসছেন, অংশ নিলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়া হত। এমনকি ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের জন্য খালেদা জিয়াকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি।

ফলে এবার নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে রাখা এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা। তাদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের লোকেরাই থাকবে। এর বাইরে কোনো দলের প্রতিনিধি রাখার সুযোগ নেই। গত নির্বাচনে বিএনপি সংসদে ছিল। এ কারণে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বার বার আহ্বান করেছিলেন নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিএনপি তাতে সাড়া না দিয়ে উল্টো সাংবিধানিক ধারাকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। এখন বিএনপি সংসদে নেই। তাই তাদের নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাবেরও কার্যকারিতা নেই।

‘তা ছাড়া সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কিন্তু সরকারের অধীনে হবে না। তখন রুটিন কাজ করবে যে সরকার, সে সরকারের কোনো মেজর পলিসি ডিসিশনের ক্ষমতা থাকবে না। নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে তারা নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, কাজ করবে। এছাড়া জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে’—এমন মতও দেন ক্ষমতাসীনরা।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, সহায়ক সরকার বলে সংবিধানে কিছু নেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হবে। এতে বিএনপিকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাই তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধানে অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকারের সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকলেও এ বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। ৫৬ এর ৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে: সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ-সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে কাউকে মন্ত্রী নিয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত আগে যারা সংসদ-সদস্য ছিলেন, তারা বহাল থাকবেন। এর ব্যাখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে যদি সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় অথবা সংসদ বহাল রেখেই একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়, তারপরও সংসদ সদস্যরা তাদের পদে বহাল থাকবেন। আর ওই অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার সদস্য নিতে হবে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও এরকম একটি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল। তখন বিএনপি সংসদে থাকলেও তারা এই সরকারে তাদের কোনো প্রতিনিধি দেয়নি। এমনকি তারা ওই নির্বাচন বয়কট করে। ফলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এবার নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির প্রতিনিধি রাখার সাংবিধানিকভাবে কোনো সুযোগ নেই। কারণ সেখানে স্পষ্টই বলা আছে যে, সংসদ ভেঙে দেওয়ার অব্যবহিত পূর্বে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী নিয়োগ করতে হবে। আবার ৫৮-এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় যেকোনো সময়ে কোনো মন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল করা যাবে।

আবার মুখে নির্বাচনকালীন সরকার চাইলেও এখন পর্যন্ত কোনো রূপরেখা দেয়নি বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বিএনপির রূপরেখা ‘যথা সময়ে’ উপস্থাপন করা হবে। তিনি সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ।

অন্যদিকে, নির্বাচনকালীন সরকার ও ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির প্রধান তিন দাবি অসংবিধানিক বলেও মতে দেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে ও ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে—বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে সহায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো কাঠামো নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচনকালীন সরকারের রূপ কী হবে, কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন বা থাকবেন না-তা নির্ধারণের একমাত্র অধিকার প্রধানমন্ত্রীর। একইভাবে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই বলেও জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এমনকি নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের যে দাবি করেছে, সংবিধানের এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পিডিএসও/হেলাল