মানসিকতার পরিবর্তনেই সমাজ পরিবর্তন

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২০, ০৮:৩০

এস এম মুকুল

আমাদের দেশের মানুষ আদিকাল থেকেই সামাজিক পুঁজি ধারণ এবং লালন করে আসছে। বিশ্বের সব দেশেই কম-বেশি সামাজিক পুঁজি ধারণ করা হয়। এ অর্থে বলা হয়, যে দেশ সামাজিক পুঁজিতে যত উন্নত; সে দেশ তত সমৃদ্ধ। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের মানুষ অন্যের বিপদে সামাজিক পুঁজি নিয়ে হাজির হলেও অনেকেই এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে না। মানবিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতি জাগ্রতকরণের মাধ্যমে সামাজিক পুঁজির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো যায়। সামাজিক পুঁজির বিকশিত অবস্থাকে ব্যবহার করে জনকল্যাণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন এবং ছোট-বড় নানা ধরনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তাই বিশ্বব্যাপী সামাজিক পুঁজির কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিকাশ এবং নানা সমস্যা সমাধানে তাকে ব্যবহার করার বহুবিধ কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। মানুষকে চিন্তা আর কর্মসাধনে উদ্বুদ্ধ করা গেলেই সামাজিক পুঁজির অর্থনৈতিক ব্যবহার সম্ভব হয়। সামাজিক পুঁজির সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। যেমন—রাস্তাঘাট মেরামত, ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত বা নির্মাণ, নদী খনন, পুকুর খনন, জলাশয় পরিষ্কার, বৃক্ষরোপণ, যৌতুক, সন্ত্রাস, ইভটিজিং, মাদকসহ সামাজিক সচেতনতায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দেশের সব উন্নয়নমূলক কাজ, সামাজিক সংস্কার, কর্মসংস্থানসহ সব ধরনের সমস্যার সমাধান করা এককভাবে কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজের মানুষদেরও নাগরিক দায়িত্ব রয়েছে। সরকার করে দেবে এমন ভাবনায় হাতগুটিয়ে বসে না থেকে নিজেদের প্রচেষ্টায় সামাজিক পুঁজির শক্তিতে সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারের সহযোগী ভূমিকায় কাজে লাগতে পারে সামাজিক পুঁজি। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটি জটিল প্রবণতা রয়েছে, তা হলো আমাদের সব কাজ করে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের দ্বারা যা সম্ভব তার জন্য কেন সরকারের জন্য অপেক্ষা করব। বরং আমাদের কাজের সফলতা দেখে সরকারই আমাদের পেছনে দৌড়াবে। আমরা মনে করি, সব কাজই সরকার করে দেবে। সরকারের দায়িত্ব আছে এ কথা ঠিক, তাই বলে সবকিছুর জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা উচিত নয়। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষেরই সামাজিক পুঁজি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই। এর যে একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে তারা তা অনুধাবন করতে পারে না। গ্রামের সাধারণ দরিদ্র মানুষও তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় একত্র করে সমবায়ের ভিত্তিতে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে পারে। এভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা যেতে পারে। এটাও সামাজিক পুঁজিরই নামান্তর। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে আমাদের প্রতিটি কাজেরই অর্থনৈতিক মূল্য আছে। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে যদি সামাজিক পুঁজির ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করানো যায় এবং এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়; তাহলে আমরা আমাদের সব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হব।

দারিদ্র্য কারো কাম্য নয়। সব সরকারই ক্ষমতায় আসার আগে দারিদ্র্য মুক্তির কথা বলে ভোটব্যাংক জোরদার করে। কিন্তু সরকারের ক্ষমতার পালাবদলে প্রকৃত অর্থে কতটা দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না। দারিদ্র্য মুক্তির জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ দরিদ্র লোকেরা পাবে, সেখানে ভাগ বসাবে না দায়িত্ব পালনকারী বা রক্ষকরা। আবার ধনীর ধনে দরিদ্ররা তাদের হক পাবে, তাহলেই দারিদ্র্য ঘোচবে। মোটকথা, শুধু ধনের নয়মনের দারিদ্র্যও দূর করতে হবে। আমাদের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী যদি দারিদ্র্যবিমোচন প্রকল্পের পুরো অংশ উপযুক্ত স্থানে ব্যবহার করেন; তাহলে পাল্টে যাবে দরিদ্রের মানচিত্র। ধনীরা যদি তাদের বিত্ত-বিলাশ থেকে কিছু অংশ গরিব মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যয় করেন; তাহলে সমাজে গরিবের সংখ্যা কমে যাবে উল্লেখযোগ্য হারে। ব্রিটেনভিত্তিক সাহায্য সংস্থা অক্সফাম তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ ধনী বছরে যে আয় করেন, তা দিয়ে বিশ্বের চরম দারিদ্র্য চারবার দূর করা সম্ভব। ‘দ্য কস্ট অব ইনইকুয়ালিটি : হাউ ওয়েলথ অ্যান্ড ইনকাম এক্সট্রিমস হার্ট আস অল’ শিরোনামে অক্সফামের এই প্রতিবেদনে বলা হয়বিশ্বের দারিদ্র্য দূর করতে যে পরিমাণ অর্থ দরকার, শীর্ষ ১০০ জন ধনীর কাছে তার চার গুণ অর্থ রয়েছে। অক্সফামের গবেষণা বলছে, অল্প কিছুসংখ্যক লোকের সীমাহীন সম্পদ দারিদ্র্য দূরীকরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবতাও আসলে তা-ই। আসুন এবার ধনীদের সম্পদ দানের কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। চীনের একজন শীর্ষ ধনী তার সব সম্পত্তি একটি দাতব্য সংস্থাকে দান করে দিয়েছেন। যার মূল্য ১২০ কোটি ডলার। সমাজকল্যাণমূলক কাজে ৮৮ বছর বয়স্ক ইউ পেংনিয়ানের বিশাল অঙ্ক দানের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। পরপর পাঁচ বছর তিনি চীনের দাতাদের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছেন। উদারভাবে দান করার মতো মহানুভবতার কারণে তাকে আমেরিকার খ্যাতনামা দানবীর অ্যান্ড্রু কার্নেগির অনুকরণে ‘চীনের কার্নেগী’ হিসেবে সম্মান করা হয়। পেংনিয়ান বলেছেন, এটাই আমার শেষ দান। কারণ দান করার মতো আমার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই! তিনি আরো বলেছেন, সন্তানদের জন্য আমার অর্জিত সম্পদ রেখে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তারা যদি অযোগ্য হয়, তাহলে রেখে যাওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থ কেবল তাদের ক্ষতিই করবে। কী অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের পুঁজিবাদী সমাজ কি এমন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করবে? আমরা বংশপরম্পরায় বিলাসের জন্য ধন-সম্পদ আভিজাত্য রেখে যাই। তবু গরিবদের সাহায্য করি না। ধনীর ধনে গরিবের হকটুকু দিয়ে দিলেও অনেকটা গরিবি হটানো সম্ভব হয়। এবার জানুন বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন ধনীর অর্ধেক সম্পদ গরিবের কল্যাণে দান করার খবর। তারা হলেনবিশ্বের বড় ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট, বিশ্বখ্যাত টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার, পৃথিবীর তথ্যপ্রযুক্তির দিকনির্দেশক মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, একসময়ের বিশ্বখ্যাত ধনকুবের ডি রকফেলারের ছেলে ডেভিড রকফেলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র আফ্রো-আমেরিকান বিলিয়নেয়ার অপরাহ উইনফ্রে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের অর্জিত সম্পদের অর্ধেক বা তারও বেশি গরিবের কল্যাণে দান করেছেন।

আমাদের জানা আছে, সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ৩২টি আয়াতে সরাসরি জাকাতের কথা বলা হয়েছে। এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, শতকরা ৮৫ ভাগ মুসলমানের দেশে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালু হলে ৫ বছরে দরিদ্র অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বলা হয়েছে, দেশে ৫ লাখ পরিবার রয়েছে যাদের নিজস্ব সম্পদ বলে কিছু নেই। আবার ২৭ লাখ পরিবার রয়েছে যাদের মালিকানায় সম্পদের পরিমাণ এক একরের কম। পক্ষান্তরে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের কাছে ভোগদখলের উপজীব্য হয়ে আছে ৯৫ শতাংশ সম্পদ। দেশের মোট জমির ৮০ ভাগ এই শ্রেণির দখলে! কী প্রয়োজন আছে এত বিত্তবৈভবের? কত টাকা প্রয়োজন একজন মানুষের এক জীবনে? এর কোনো উত্তর কি আছে? আমাদের দেশে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অগণিত সফল ব্যবসায়ী, বিত্তবান, ধনাঢ্য, শিল্পপতি রয়েছেন, যাদের কাছে কোটি কোটি টাকা এখানে-সেখানে গচ্ছিত অলস অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকে। সমাজের সব ধনী মানুষ যদি গরিব মানুষের কল্যাণে তাদের অর্জিত অতিরিক্ত সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ জাকাত হিসেবে ব্যয় করেন; তাহলেও দারিদ্র্যবিমোচনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এভাবে প্রত্যক সামর্থ্যবান মানুষ যদি নিজ নিজ গ্রামের গরিব এবং অসামর্থ্যশীল আত্মীয়স্বজনকে দোকানপাট, কুটির শিল্প, নৌকা, ট্রলার, ভ্যানগাড়ি, মাছ ধরার জাল, রিকশা বা উপার্জনমুখী ব্যবস্থায় দান বা সহায়তা করেন; তাহলে সামাজিকভাবে সর্বোপরি রাষ্ট্রের মাঝে ধনী-দরিদ্রের বিস্তর ব্যবধানে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। এভাবে সমাজের সবস্তরের মানুষ যদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করেন; তাহলে আমাদের সমাজ থেকে বস্তিবাসী, ছিন্নমূল, টোকাই, পথশিশুএসব নির্মম মানবতার শব্দগুলো বিলুপ্ত হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনতে পারি। এজন্য শুধু ধনের নয়, মনের দারিদ্র্যও দূর করা দরকার।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট 
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল