চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকল্পে পদক্ষেপ জরুরি

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২০, ০৯:০৯ | আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২০, ০৯:১৫

রায়হান আহমেদ তপাদার

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা বিরাজমান। তাদের প্রত্যেকেরই বুকে রয়েছে অসন্তুষ্টির জমানো অনেক কাহিনি। কিন্তু তার পরও মানুষ শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাকর্মীদের কাছেই আশ্রয় নেন। মানুষ বাঁচতে চায়। জীবন বাঁচাতে তারা নির্ভর করেন চিকিৎসাকর্মীদের ওপরই। সমস্যা হলো আমাদের চিকিৎসাসেবা অবহেলার বলয়মুক্ত হয়ে অগ্রাধিকারের শীর্ষে স্থান পায়নি। যদি পেত, তাহলে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র পাঁচজন ডাক্তার বরাদ্দ থাকত না। আমাদের দেশে ৭৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে আর দেশের মোট চিকিৎসকদের প্রায় ৭০ শতাংশ বাস করেন ঢাকাসহ বড় বড় শহরে। এটা একটা বিরাট বৈষম্য এবং যা আমাদের চিকিৎসাসেবাকে বিরাট ভারসাম্যহীন করে ফেলেছে। চিকিৎসাসেবার বিরাজমান এই গ্যাপ কমানোর জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সরকারের আমলে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার সেন্টার চালু হয়েছে। জানা মতে, সারা দেশে ১৩ হাজার কমিউনিটি হেলথ কেয়ার সেন্টার রয়েছে। এর ফলে গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার কিছুটা অ্যাকসেস পেলেও সেখানে সেবা উপকরণ অপর্যাপ্ত। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মানও প্রশ্নবিদ্ধ। সেখানে করোনা পরীক্ষার পিসিআর ল্যাব স্থাপন হয়তো বহুদূরের স্বপ্ন, কিন্তু যে যন্ত্রগুলো, যে সেবাগুলো উপজেলা পর্যায়ের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাওয়া যায় তা কিন্তু আমাদের উপজেলা হাসপাতালে পাওয়া যায় না।

বিবিসি তাদের গবেষণায় বলেছে, ঢাকার বাইরে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পদ শূন্য। তৃণমূলে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য সেবাকর্মীর এই শূন্যতা আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। আর এতে করে মানুষ সরকারের সদিচ্ছার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। আমরা যদি উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকেও সেবাসম্পন্ন বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলেও দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন গতি আসবে। ডাক্তাররা গ্রামে থাকবেন তার জন্য যা করা প্রয়োজন সরকারকে সেটা করতে হবে। কমিউনিটি হেলথ সিস্টেমকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে চাইলে সেখানে খরচ বাড়ানো যেতেই পারে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে দেশের মানুষ কখনই অখুশি হবে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতে, সারা দেশে যেখানে ন্যূনপক্ষে সাড়ে তিন হাজার কনসালট্যান্ট চিকিৎসক দরকার; সেখানে আছে মাত্র ১৫০০ বা সামান্য বেশি কিন্তু তাদের বেশির ভাগই থাকেন ঢাকাসহ বড় বড় শহরে। গ্রামের মানুষ তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত। আমাদের চিকিৎসাসেবায় কেবল ডাক্তার, নার্স বা অন্যান্য সেবাকর্মীর অভাবই বড় তা নয়, আমাদের অবকাঠামো খুবই ভঙ্গুর। এবার করোনাকালে সারা দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডারের যে ভয়াবহ সংকট দেখা গেল, তা থেকেই বোঝা যায় স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের মনোযোগের ঘাটতি কত তীব্র। চিকিৎসা খাতে আমাদের সংকটের তালিকা অনেক লম্বা। করোনাকালেও আমরা লক্ষ করছি, করোনায় মৃতদের মধ্যে নারীর তুলনায় পুরুষের হার বেশি। আমরা চাই দেশের নারী-পুরুষ সবারই আয়ু বাড়বে। সবাই বেশি দিন বেঁচে থাকবে। এর জন্য সরকারের অগ্রাধিকার কেবল কাগজে রাখলে হবে না। বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের এ চলমান দুঃসময়ে করোনা সংক্রমণের ভয়ে সাধারণ মানুষ যখন দিন দিন ভীত হয়ে পড়ছে, সরকার একটার পর একটা কার্যক্রম গ্রহণ করছে ও করোনা সংক্রমণ প্রতিহত এবং নিয়ন্ত্রণ করে জনগণকে সংক্রমণ আতঙ্ক থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেএটা সত্যিই প্রশংসনীয়।

এমনকি রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় নকল মাস্ক আর ভেজাল স্যানিটাইজারের রমরমা ব্যবসা শুরু হয়ে গেছে। আমাদের দেশের কিছু মানুষ যে একটু সুযোগ পেলেই অনৈতিক ব্যবসায়ে যুক্ত হয়ে যায় কোনো কিছু না ভেবেই, এটা তো সবাই জানেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আছে, সম্প্রতি নিউমার্কেট ও অন্যান্য আরো কিছু এলাকা থেকে লাখ লাখ টাকার ভেজাল মেডিকেল সুরক্ষাসামগ্রী উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে অভিজ্ঞদের ধারণা, শুধু ধরে ফাইন মানে জরিমানা করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না বরং এদের উৎপাদনস্থল কারখানা বন্ধ করে দিয়ে এ কাজের হোতাদের দুই মাস-এক বছরের জন্য জেলে ঢোকাতে হবে; যাতে করে এ সময়ে নতুন করে আবার এই ভেজালসামগ্রী উৎপাদন করতে না পারে। এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের কেনাকাটায় বড় বড় দুর্নীতি আর করোনাকে কেন্দ্র করে যেসব মানুষ অনৈতিক ব্যবসা ফেঁদেছে তাদের কথা যখন ভাবি, তখন সাধারণ মানুষের দুর্দশা আর ভোগান্তির কথা আরো বেশি করে মনে আসে। এই করোনাকালীনও কেন তারা ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না, ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে মফস্বল শহরগুলোতে? মনে কষ্ট এবং ক্ষোভ দুটোই হয় যখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুটি বিভাগ খুলনা ও বরিশালের ১৬ জেলায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি পিসিআর ল্যাব। যার একটি খুলনায়, একটি যশোর এবং অন্যটি বরিশালে। জানা যায়, বরিশালে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ রোগী করোনা টেস্ট করাতে এলেও তাদের মধ্যের শ’ দেড়েকের বেশি টেস্ট করাতে পারে না। কারণ প্রতিদিন এই ল্যাবে আড়াইশর মতো টেস্ট করতে পারলেও বরিশাল জেলা ছাড়া অন্য পাঁচ জেলা থেকেও টেস্টের জন্য স্যাম্পল পাঠানো হয় বরিশালে। এ পরিস্থিতিতে আরো খারাপ অবস্থা খুলনা এবং যশোরে। অবস্থার ক্রমাবনতি হচ্ছে সব জায়গাতেই।

এ অবস্থার মধ্যে হঠাৎ যদি কোনো পিসিআর ল্যাব কোনো কারণে দুয়েক দিনের জন্যও বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সার্বিক পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াবে; সেটা সহজেই অনুমেয়। এখানেই আমাদের সেই প্রশ্নটা উঠে আসে যে, সাধারণ মানুষ যেখানে দিনের পর দিন ঘুরেও শুধু পিসিআর ল্যাবের অভাবে ঠিকভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না, সেখানে আরো দুয়েকটা পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা কি স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য খুবই কঠিন কোনো কাজ? যতদূর জানি, একটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনে বেশ বড় ধরনের খরচের ব্যাপার আছে। কিন্তু সরকারের জন্য সেটা তো এমন কোনো বিষয় নয়, যেখানে প্রকাশিত খবর অনুসারে কোটি কোটি টাকার সামগ্রী কেনাকাটার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ টাকাই চলে গেছে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সদস্যদের পকেটে। এদের বিচার এবং শাস্তি আমাদের দেশে কি কখনই হবে না!

প্রকৃতপক্ষে সাধারণ ছুটি আর লকডাউনের বিষয় দুটি এখনো আমাদের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়, পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি না, এত দিন পরে ক্রমে ক্রমে অনেকটা আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার পরেও আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষ কেন বুঝতে পারছে না যে, মাস্ক পরাটা জরুরি, জরুরি ঘরে থাকা, অহেতুকভাবে রাস্তায় ঘোরাঘুরি না করা, ৬ ফিটের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা—এসবের গুরুত্ব বুঝতে আমাদের আর কত সময় লাগবে? সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমরা এসব ঠিকভাবে না বুঝলেও এ সময়েও নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে কিন্তু অনেক মানুষের বিবেকে বাধে না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে, এখন যেন করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত ও মৃত্যু হওয়ার ঘটনা অনেকটা স্থিতিশীল অবস্থায় আসছে। গত দুই সপ্তাহের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার ওঠানামার তুলনামূলক বিচারে বড় ধরনের কোনো হেরফের দেখা যাচ্ছে না। এদিকে অবস্থার গুরুত্ব বুঝে সরকার শেষ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও করোনা টেস্ট ও চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছে। টেস্টের জন্য ফি বেঁধে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু কদিন পরেই দেখা গেল, সাধারণ অসহায় মানুষকে অনেকটা জিম্মি করেই নানা কৌশলে টেস্টের জন্য কোনো কোনো হাসপাতাল রোগীর কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছে চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত। অনেক ভুক্তভোগী এ ধরনের অভিযোগের পাশাপাশি আরো বলেছেন যে, কোনো কোনো হাসপাতালে করোনা টেস্টের আগে আরো কিছু টেস্টের কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি টাকা। যে রোগীর আইসিইউতে থাকতে হচ্ছে তাদের অভিযোগ আরো বেশি। কখনো একবার ১০ মিনিট অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে বিল করা হয়েছে ৫ গুণেরও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন সব মিলিয়ে ৫৫০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি রাজধানী ঢাকায়। এতে মোট আইসিইউ বেড রয়েছে ৭৩৭টি। এরমধ্যে ঢাকায় ৪৯৪টি এবং ঢাকার বাইরে ২৪৩টি। সংকট বেড়েছে তো এ কারণেই, আর জিম্মি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ওলটপালট হওয়া অর্থনীতি সত্ত্বেও আমরা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করা জরুরি।

পরিশেষে বলব, মানুষের কল্যাণে সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুশীলন করাটাই জরুরি। কারণ করোনা মহামারির প্রভাবে প্রকৃত সমস্যার চেয়ে আতঙ্ক রয়েছে আরো অনেক বেশি। করোনা পরীক্ষার সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়া, নমুনা হারিয়ে যাওয়া, ফল আসতে দেরি হওয়া ইত্যাদি সমস্যা তো আছেই তার ওপর যুক্ত হয়েছে রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা। এমনকি আজকাল ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার এজেন্সিও গড়ে উঠেছে। অসহায় মানুষগুলোকে জরুরিভাবে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে। এমনিতেই করোনার ফলে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মানুষ হাসপাতালগুলোতে সেবা পাচ্ছে না, সেসময়ে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ সর্দি, কাশি বা জ্বর নিয়ে হাসপাতালে গেলে যদি তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যদি তাদের বলা হয়, আগে করোনা পরীক্ষা করে আসেন, তাহলে সেটা হবে অমানবিক ও নিঃসন্দেহে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’! আশা করি সরকার ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত যোদ্ধারা মানুষের প্রতি সদয় হবেন, তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করবেন এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই চিকিৎসা নিতে আসা সবাইকেই সেবা দেবেন, ফিরিয়ে দেবেন না কাউকেই। দয়াকরে অমানবিক হবেন না। গণমাধ্যমে প্রতিদিনই ছবিসহ সংবাদ ছাপা হচ্ছে চিকিৎসা খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ভয়ে অনেকেই এখন চিকিৎসা নিতেও যাচ্ছেন না। এই ভয়টা দূর করা দরকার। সবার মনে মানবতাবোধ জাগ্রত হোক এবং আগামী দিনের বাংলাদেশে চিকিৎসা সক্ষমতার বৃদ্ধি হোক—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল