দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই সময়ের দাবি

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২০, ০৮:৩০

সম্পাদকীয়

বাসাবাড়ির দারোয়ানই যদি ডাকাত দলের সদস্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই বাড়ির নিরাপত্তার কী হাল হতে পারে, তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটা সে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আর সে কারণেই দেশের বেশির ভাগ মানুষই আজ উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেছেন, দুর্নীতি মহিরুহ হয়ে গেছে, কাউকে আর ছাড় নয়। তিনি তার পূর্বঘোষিত জিরো টলারেন্সের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরাও তার এই ঘোষণার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে বলতে চাই, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে দেশে একটি মাইলফলক তৈরি করা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আশা করি সরকার এবার তা প্রমাণে সক্ষম হবে।

ক্যানসারের চেয়েও ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হলো দুর্নীতি। একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাকালে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি হলে কঠোর শাস্তির কথা ঘোষণা করার পরও তেল, চাল আর নগদ টাকা বিতরণে যে দুর্নীতির খবর বেরিয়ে এসেছে তাতে জাতির আর আশার জায়গা নেই। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে যথার্থই বলা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ত্রাণ হিসেবে কাফনের কাপড়ও দিতে যান, তাহলে কতিপয় লোক এই কাফনের কাপড় চুরি করে পাঞ্জাবি বানাবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দুঃখ করেই অকপটে বলে ছিলেন—কৃষক, শ্রমিক দুর্নীতিবাজ না। আমরা শিক্ষিত সমাজের মানুষগুলোই দুর্নীতিবাজ।

দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সমাজ থেকে এই ব্যাধিকে হটাতে হলে প্রয়োজন সামাজিক গণজাগরণ। সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এই ব্যাধি হটানো যাবে না। আমরা সবাই কথায় কথায় দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপের কথা বলি। এ কথা ঠিক সরকার চাইলে দুর্নীতি কমে যাবে। তবে একেবারে হটানো সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, নাগরিক সচেতনতা। নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা দরকার। সততার মূল্যায়নে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা দরকার। তার মানে দুর্নীতি নির্মূল করা একটা সামগ্রিক কার্যক্রম বটে। একাকী সরকার এ কাজ করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি হলো এক ধরনের প্রবণতা। এই প্রবণতা আগে দূর করা দরকার। যেমন আইন না মানাও এক ধরনের প্রবণতা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে পরিচালিত অভিযানে অনেক ভয়ংকর, লজ্জাস্কর তথ্য বেরিয়ে এসেছিল। বনরক্ষক ওসমান গণির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে, যার ঘরে বালিশের ভেতর, চালের ড্রামের ভেতর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়া গিয়েছিল। তখনকার সরকারের উপদেষ্টারা বলেছিলেন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাইলে পুরো দেশটাকেই কারাগার ঘোষণা করতে হবে। আমরা খুব বাহবা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেসময়ে দুর্নীতিমুক্তকরণের অভিযানকারীদের অনেকে দুর্নীতি করে আখের গুছিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আছে। তাহলে কী করে দুর্নীতিমুক্ত হবে বাংলাদেশসেটাই ভাবার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের সার্বিক উন্নয়নে অনেক পরিশ্রম করেছেন এবং এখনো করছেন। কিন্তু কতিপয় দুর্বৃত্তের কারণে প্রায়ই তা মলিন হয়ে পড়ছে। সমালোচনার পাত্র হতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে। সাধারণ মানুষের কথা হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে কেন এ দায় বহন করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশ ও আমজনতার প্রতিনিধিত্ব করেন। আর সে কারণেই আমরা চাই দুর্নীতি দমন প্রশ্নে তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন সমাজে তার প্রতিফলন হোক।

পিডিএসও/হেলাল