পরিবেশ রক্ষা ও মূল্যবোধ

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২০, ১৭:১৫

শ্যামা সরকার

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এতটাই ভয়াবহ যে, এটি থমকে দিয়েছে গোটা বিশ্ব। বিশ্বজুড়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে মানবজাতি। মারা যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানবকুলে ‘ত্রাহি ত্রাহি’ রব উঠেছে। এর থেকে কবে মুক্তি মিলবে, কখন স্বাভাবিক হবে কর্মপরিবেশ এবং সর্বোপরি কবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসবে মানুষ- এসব দুশ্চিন্তাই ভর করছে খেটে খাওয়া মানুষের মনে।

ডিসেম্বর ২০১৯ ইং তারিখে চীনের উহান থেকে এই ভাইরাসের বিস্তাার শুরু। এ কারণে উহান শহরের সঙ্গে অন্য শহরগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। 

এ পরিস্থিতিতে ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে আক্রান্ত দেশগুলো নিজেরাই লকডাউনে যায়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের দিক দিয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব পরিস্থিতির এ সংকটময় মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই এদেশের মানুষের মধ্যেও ভর করেছে করোনা আতঙ্ক আর উদ্বেগ।

যেহেতু, বিশ্বের অন্যান্য দেশ মতো বাংলাদেশও কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়, তাই গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, শিল্পকারখানা, ইটের ভাটা। সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতের কাজও অনেকাংশে সীমিত করা হয়েছিল। ঘোষণা করা হয়েছিল  সাধারণ ছুটি। নিষিদ্ধ ছিল সকল ধরনের গণজমায়েত। বন্ধ ছিল গণপরিবহন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমিত রাখা হয়েছিল যানবাহন চলাচল। অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল মানুষের আনাগোনা। সব কিছু ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ঢাকা ছেড়েছিল অনেক মানুষ। এর ফলে ঢাকা ছিল অনেকটাই ফাঁকা। পরিবহনের ক্ষতিকর ধোঁয়া ছিল না বললেই চলে। আর এ কারণে কমে ছিল বাতাসের দূষণ ও শব্দ দূষণের মাত্রা। 

কিন্তু মে ৩১, ২০২০ ইং তারিখে অফিস, কলকারখানা, শপিংমল থেকে শুরু সবকিছু খুলে দে;য়া হয়েছে। এ কারণে হয়তো বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণেই স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নানা রোগে ভুগছে নগরবাসী। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে এ শহরের চারপাশে অবস্থিত ইটভাটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামরীর কারণে প্রকৃতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। ফিরে পেয়েছে নিজস্ব রূপ। 

আজ ৫ জুন। ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত মান উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ আর জনসচেতনতার লক্ষ্যে পালন করা হয় দিবসটি। প্রতি বছরই এ দিবসটি আলাদা প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (টঘঊচ) কর্তৃক এ বছরের ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জীববৈচিত্র্য’। 

প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয় বিশ্বব্যাপী। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালের ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের কাছে একটি চিঠি পাঠায় সুইডেন সরকার। সে বছরই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সাধারণ অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরের বছর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সমাধানের উপায় খুঁজতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ জুন থেকে ১৬ জুন, জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন (টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈড়হভবৎবহপব ড়হ ঃযব ঐঁসধহ ঊহারৎড়হসবহঃ) অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি ইতিহাসের ‘প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন’-এর স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে জাতিসংঘ ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

কিন্তু আজ এই পরিবেশ বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট বিশেষ কোনো গোষ্ঠী, দেশ বা জাতির নয়; সমগ্র মানবজাতির। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশ আজ বিপন্ন। মানুষের বসবাস উপযোগী বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ। বিভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় ‘পরিবেশ দিবস’।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় ভারত ও চীনের পরে বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যদিকে, বড় শহরগুলোর মধ্যে দূষণের দিক দিয়ে বিশ্বে রাজধানী ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। ইন্টারন্যাশনাল গেøাবাল বার্ডেন ডিজিজ প্রজেক্টের প্রতিবেদনে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বায়ুদূষণকে চার নম্বরে দেখানো হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৫৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকরী পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে ভয়াবহ বায়ুদূষণে পড়বে বাংলাদেশ। 

এদিকে, কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস (সিএএমএস) ও কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সি৩এস) নিশ্চিত করেছে যে, লকডাউনের কারণে কার্বন নিঃসরণ কমে আসায় ওজন স্তরে যে বিশাল ক্ষত বা গর্ত তৈরি হয়েছিল তা পৃথিবী নিজেই সারিয়ে তুলছে। এর আগে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এপ্রিলের শুরুতে বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর আকাশে ওজন স্তরে ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ বর্গকিলোমিটারের একটি বিশাল গর্ত তৈরির কথা জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। এই গর্ত দক্ষিণের দিকে মোড় নিলে সরাসরি হুমকির মুখে পড়তো বিশ্ববাসী।

করোনাভাইরাসের কারণে যখন বেঁচে থাকার শঙ্কায় মানুষ, তখন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে  পেয়েছে বিশ্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং শহর লক ডাউন থাকায় বন্ধ হয়েছে কারাখানা এবং যানবাহন চলাচল। এতে কমেছে পরিবেশ দূষণের মাত্রা। দূষণমুক্তের তালিকায় রয়েছে : চীন, ইতালি, ভারত, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগাল। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে গভীর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
এই ভাইরাসের কারণে কার্যত লকডাউন বিশ্বজুড়ে। এই ভাইরাস প্রকোপে বিশ^বাসীকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এর ফলে প্রকৃতিতে পড়েছে এক অদ্ভুত প্রভাব। প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে নিজস্ব রূপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আকর্ষণীয়ভাবে কমেছে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রকোপ। পাশাপাশি কমেছে দূষণের মাত্রাও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাতাসের দূষণ অনেক কমেছে। স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা বায়ুদূষণের মাত্রা ২৫০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত থাকে। এক জরিপে দেখা গেছে, পর পর কয়েক দিন ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ১৯৫, ১৫৭। যানবাহন ও শিল্প কারখানার কালো ধোঁয়া বর্তমানে ঢাকার আকাশে নেই। সে কারণেই বায়ুদূষণের মাত্রা ৯৩-এ নেমে এসেছে। সুতরাং বলা যায়, যারা বায়ুদূষণের সঙ্গে জড়িত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যারা তাদের মনিটরিং করবে, উভয়েই যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে ঢাকার বায়ু স্বাস্থ্যকর থাকবে। শুধুমাত্র লোকাল পলিউশন নয়, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত রয়েছে। যেমন : বায়ুপ্রবাাহ, বৃষ্টিপাত, অন্য স্থানের দূষণ হলেও তার প্রভাব ঢাকায় পরতে পারে। তাই এ দূষণে নগরবাসী সচেতন হলে ঢাকার বায়ু স্বাস্থ্যকর রাখা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, বায়ুর মান শূন্য থেকে ৫০ থাকা মানে বায়ু স্বাস্থ্যকর। ৫০ থেকে ১০০ হচ্ছে সহনীয় অবস্থা। ১০০ থেকে ১৫০ সংবেদনশীল, ১৫০ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০০ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর, ৩০০ থেকে ৫০০ হচ্ছে বিপদজনক অবস্থা।

জীবনযাত্রাকে থমকে দেয়া করোনাভাইরাস প্রকৃতিতে যেন আশীর্বাদই হয়ে এসেছে। ঢাকার আকাশে খেলা করছে নীল ও সাদা মেঘ, রাতের আকাশে মিটি মিটি করে জ¦লছে তারকারাজি। গাছে গাছে ফুটেছে মন মাতানো হরেক রকমের ফুল। গাছের মগডালে বসে ডাকছে কোকিল ও ঝিঁ ঝিঁ পোকা। এ যেন সত্যিই বাংলার চিরাচরিত রূপ। যা এক সময় শুধু উপভোগ করেছে গ্রাম-বাংলার মানুষ। নগরবাসীর আত্মোপলব্ধিকে জাগিয়ে তোলার এ অপার কৌশল প্রকৃতিদেবীর। তাই প্রকৃতি নিজের সুষমা, সৌন্দর্যরাশি যেন একের পর এক তুলে ধরেছে।

করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। বাংলাদেশেও পড়েছে এর প্রভাব। এ কারণে মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ক্ষতির মুখে পড়েছে এ দেশের পর্যটনশিল্প। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে তার নিজস্ব রূপ। যেন অচেনা রূপ ধারণ করেছে পর্যটন স্পটগুলো। পর্যটন স্পটগুলো একেবারেই ফাঁকা। শহর দূষণমুক্ত। নেই প্রাণের কোলাহল। পাহাড়গুলো ফিরে পেয়েছে তার সৌন্দর্য। পাহাড়ের মাঝে ছোট ছোট লেক, ঝরনা, আর নদীর পানি এতোটাই স্বচ্ছ, যা আগে কখনো কেউ দেখেনি।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারেও নেই কোন কোলাহল। সৈকতের বুকে জনমানবের পদচারণা না থাকায় নীরবে সবুজ গালিচা তৈরি করায় ব্যস্ত ‘সাগরলতা’। সবুজ এ গালিচায় ফুটেছে অগণিত জাতের নাম না জানা বাহারি রঙের সব ফুল। বাসা বেঁধেছে লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও গাঙ কবুতরের দল। সাগরপাড়ে রয়েছে কচ্ছপের অবাধ বিচরণ। সমুদ্রের বিশাল বেলাভ‚মিতে ঘুরে বেড়াাচ্ছে কচ্ছপের দল। বালুর মধ্যে ডিম পাড়ছে। বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকা সামুদ্রিক এ কচ্ছপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়, বিশেষ করে খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। এ ছাডা সাগরের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এসব কচ্ছপ। অন্যদিকে, বহু বছর পর সমুদ্রে ডিগবাজিতে মেতেছে ডলফিন। ডলফিনের এ মনোমুগ্ধকর নৃত্য যেন পরিবেশ-প্রকৃতির এক অপার লীলা।

কেবল কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতই যে জীববৈচিত্র্যের এ খেলায় মেতেছে? না মেতেছে সাগরকন্যা কুয়াকাটাও। এর বেলাভূমিতে লাল কাঁকড়ার আলপনা আকার দৃশ্য ও অবাধ বিচরণ যেন এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, এ সৈকত শুধুমাত্র তাদেরই অধীনে।  

পরিবেশবাদীদের মতে, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে থাকলেও এখন আর সেই দৃশ্য নেই। আশার কথা হলোÑ অন্তত এ সংকটময় মুহূর্তে প্রকৃতি তার নিজের রূপ ফিরে পেয়েছে। এ অবস্থাকে ধরে রাখতে হবে। তাই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যটক আগমন সীমিত এবং পর্যটন শিল্পকে পরিবেশবান্ধব গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন ও প্রকৃতি দুটোকেই রক্ষা করা সম্ভব। 

পরিবেশবাদী ড. মিহির কান্তি মজুমদার। পরিবেশ ও প্রকৃতির পরম বন্ধু। যিনি প্রকৃতি সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’ এবং ‘চ্যানেল আই’-এর পক্ষ থেকে ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক ২০১৮’ প্রদান করেছে।

ড. মিহির কান্তি মজুমদার শিক্ষাজীবন শেষ করে বিসিএস ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করেন। দাপ্তরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে মেহের মুসুলি বৃক্ষরোপণ ট্রাস্টসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি গণমুখী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ও কর্মকৌশল-২০০৯, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন-২০১০, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন-২০১২ এবং জাতীয় পরিবেশ পদক নীতিমালা-২০১০ প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি বাঘ, হাতি ও কুমিরের মাধ্যমে মানুষের জীবনহানির ক্ষতিপূরণ এবং শকুন সংরক্ষণে ডাইক্লোফেনাক ওষুধ নিষিদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখেন। 

প্রকৃতিপূজারী এই নির্মল মানুষটির কথা অনেকেই হয়তো জানেন না। পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ড. মিহির কান্তি মজুমদার শুধু প্রকৃতি প্রেমেই নয়, দূষণমুক্ত পরিবেশ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনায়ও অগ্রগামী। তার এ অনুপ্রেরণায় নতুন করে চিনতে শেখায় প্রকৃতিকে, উপলব্ধি করতে শেখায় জীবনকে।

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নীতির ওপর ভিত্তি করে ‘রূপকল্প ২০২১’ (২০১০-২০২১) এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। প্রঙ্গত বলা যায়, সরকার জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জনের জন্য সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবেশ সংশ্লিষ্ট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অধিদপ্তর/সংস্থা স্ব স্ব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগোপযোগী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কার্যকরভাবে মোকাবেলায় বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদানপূর্বক বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ে একটি পৃথক অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সুস্থ পরিবেশকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এছাড়া, বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ অভিঘাতের সাথে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজন এবং প্রশমন বা কার্বন নিঃসরণ হ্রাস- এ দুই খাতেই বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি সরকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ জারি করেছে। সরকার দেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কিছু এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ৩৮টি বনসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকাকে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও বেতারগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করে। এছাড়া এ দিবসটিতে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও এনজিওগুলো সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মানববন্ধন, সভা, সমাবেশ, র‌্যালি, মতবিনিময় সভা, পরিবেশ সম্পর্কিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ উদযাপন, পরিবেশ বিষয়ে প্রচার ও প্রচারণা ও পরিবেশ সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবারে বিশ^জুড়ে মহামারীর কারণে সকল অনুষ্ঠান সীমিত আকারে করা হয়েছে। 

বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত বাসযোগ্য একটি সুস্থ, সুন্দর, টেকসই ও পরিবেশসম্মত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এ বাহিনী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়ও রয়েছে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

পরিবেশ অধিদপ্তর মনে করে, করোনার কারণে পরিবেশে যে পরিবর্তন এসেছে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে ঢাকা শহরের পুরনো গাড়িগুলোকে বাদ দিতে হবে। যাতে এর থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া বায়ূকে দূষিত করতে না পারে। এদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি থাকবে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা, পানি ও বায়ুদূষণ এবং জীববৈচিত্র্য ও মাটির ওপর বিরূপ প্রভাবে পরিবেশের গুণগতমানের অবনতির কারণে মারা যাচ্ছে হাজারো মানুষ। আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এর প্রতিকার না করি, তাহলে এর ফল হবে ভয়াবহ। ধ্বংস হবে প্রাকৃতিক সম্পদ, বাড়বে অভিবাসন এবং সেই সঙ্গে বাড়বে সংঘাত।

এসব কিছু রক্ষা করার জন্য এপ্রিল ২৯, ২০২০ ইং তারিখে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, করোনা পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে ভিডিও কনফারেন্সে দেয়া এক বক্তব্যে এ আহ্বান জানান তিনি। এ সময় তিনি আরো বলেন, এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সাহসী ও সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব। শ্রেষ্ঠতর পৃথিবী গড়তে বিরল এক সুযোগ পেয়েছেন বিশ্ব নেতারা। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক হুমকি মোকাবেলায় তাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানান। এছাড়া মহামারী থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে মানুষের নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও সহিষ্ণু পৃথিবী গড়ে তোলারও আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।

জাতিসংঘ মহাসচিবের এ আহ্বানে বাংলাদেশও সাড়া দেবে। কারণ বিশ্বকে বসবাসযোগ্য করার লক্ষ্যে দূষণমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। তবে মানুষের সচেতনতার অভাবে আজ তা অরক্ষিত। নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে। 

সর্বোপরি, শিল্পায়ন বিশ্বকে করেছে অনেক উন্নত ও আধুনিক। তাই শিল্পায়নের অগ্রগতি বজায় রেখেই বিশ্ববাসীকে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে উদ্বুদ্ধ এবং পরিবেশবাদী সংগঠন ও মিডিয়াগুলোকে এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : ম্যানেজার (কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ) প্রধান কার্যালয়, উদ্দীপন।