গড়ে উঠুক ধূমপানমুক্ত পৃথিবী

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২০, ০৯:১৬

কে এম মাহ্ফুজুর রহমান

গতকাল ছিল বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বব্যাপী ‘Protecting youth from industry mainpulation and preventing them from tobacco and nicotine use’ তথা যুবকদের শিল্পের কারসাজি থেকে রক্ষা করা এবং তাদের তামাক ও নিকোটিন ব্যবহার রোধ করা’ এই প্রতিপাদ্য বিষয়ে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। বস্তুত একটি সুস্থ দক্ষ মানবসম্পদ জাতি গঠনে তামাক প্রধান অন্তরায়। মূলত তামাকই মাদকের প্রবেশদ্বার। বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ১৯৮৭ সাল থেকে তামাক নিধনে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণে করাতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

তামাক সেবন দুইভাবে হতে পারে ধোঁয়ার মাধ্যমে এবং গুল, জর্দা ইত্যাদি ধোঁয়া ছাড়া প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সরাসরি সেবন করে। তামাকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষেত্রে যেমন প্রভাব ফেলছে অন্যদিকে কৃষি প্রধান এই দেশের জমির উর্বরতা হ্রাসকরণ, পরিবেশ ও আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আশার দিক হলো সরকারের জনসচেতনতা ও ক্রমান্বয়িক আইনি কঠোরতায় প্রকাশ্যে সেবন করাটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আজকের পৃথিবীব্যাপী মহামারির এই যাত্রায় সুরক্ষায় একমাত্র অবলম্বন নিজেদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সক্ষমতা বাড়ানো। ধূমপানমুক্ত সুস্থ পৃথিবী গড়তে তামাকের চাহিদা হ্রাসকরণ প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার করে আগামীর প্রজন্মকে একটি সুস্থ জাতি গঠনে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বের অনেক অঞ্চলে জনসচেতনতা ও আইনি কঠোরতায় ধূমপান তামাক সেবনের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে তামাক নিয়ন্ত্রণের নানা কর্মসূচি থাকলেও ধুমপায়ীদের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিশ্বে ধূমপায়ীর সংখ্যা শতকোটির উর্ধ্বে। ধূমপানের অভ্যাস থেকে জনগণকে ফিরিয়ে আনতে জনসচেতনতায় অধিক আইনি কঠোরতায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে তাদের মধ্যে নরওয়ে, কানাডা, মেক্সিকো, আইসল্যান্ড অন্যতম। এ ছাড়াও নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, পানামা, ইরিত্রিয়া এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সফল হয়েছে। তথা বিশ্বজুড়ে ২২ শতাংশ মানুষ ধূমপান করলেও আফ্রিকায় এই পরিসংখ্যান ১৪ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্স, বাংলাদেশ, চীন, কিরিবাতি, গ্রিস ও রাশিয়াসহ আরা বেশ কিছু দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তবে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা অনুপাতে বিশ্বজুড়ে ধূমপায়ীর সংখ্যা নিম্নমুখী।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে তামাকবিরোধী কর্মসূচির নীতি নির্ধারকরা বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত। হু’র তথ্য মতে বিশ্বের প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে। আর এই তামাকের পরোক্ষ প্রক্রিয়ার প্রভাবে তামাক সেবন না করেও প্রায় ৬ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝঁকিতে থাকে। যেখানে আমাদের বাংলাদেশেই হু’র ২০০৪ সালের জরিপ মতে তামাকজনিত রোগে ৫৭ হাজার মানুষ মারা যায়। পঙ্গু হয় ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ। তবে বর্তমানের এই সময়ে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা বলা মুশকিল। দেশের তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংস্থা একটি তামাক সেবনের মাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসতে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন সেটি আনন্দের বিষয় হলেও দুঃখের সংবাদ হলো তামাক তথা ধূমপান পুরোপুরি না করে এর মাত্রা কমিয়ে তেমন কোন লাভ নেই।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (বিএমজে) গবেষণায় বলা হচ্ছে, দিনে একটি সিগারেট খেলেও হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের ক্ষরণে ঝুঁকিও বাড়ে ৩০ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি। বাস্তবিক পর্যবেক্ষনে আমরা কতটা অবিবেচকের মতো কাজ করছি! সংকটাকালীন এই সময়ে অন্য পণ্য না পেলেও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় বিড়ি সিগারেট। এই মহামারিতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ বাড়াতে চিকিৎসকরা তামাক সেবনের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে প্রতিনিয়তই দরস দিচ্ছেন। আমরা দুই কান দিয়ে শুনে নাকের ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া বের করে দিচ্ছি।

আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে মাদকের যে অভায়ারণ্য শুরু হয়েছিল তা সরকারের শুদ্ধি অভিযান কিছুটা কমেছে। এখন সময় আগামী দিনের এই কারিগরদের দক্ষ ও যোগ্য মেধাবী একটি জাতি গঠনে তামাক সেবন থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা আর আইনি কঠোরতায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসা। বন্ধুদের ইয়ারকির ছলে আজকে যে সিগারেট মুখে নিচ্ছেন। সময়ের পরিক্রমায় এরাই বাতিক নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়। মূলত তামাকই নেশাগ্রস্ত হওয়ার প্রবেশ পথ। প্রাথমিকভাবে যারা ধূমপান করেন তাদের নেশায় আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। মানসিক বিকারগ্রস্ত হয় ৪৪ শতাংশ।

আমাদের দেশের সরকারের তামাকবিরোধী আইন প্রণয়নের বিষয়টির প্রশংসাযোগ্য। তামাকের ভয়াবহতা রোধে ২০০৩ সালে এফসিটিসিতে (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনি রূপ পায়। আইনটি কিছু জটিলতা আর প্রশ্নবিদ্ধের কারণে পূর্ণাঙ্গরূপে সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি সংশোধিত আকারে পাস হয়। সর্বশেষে গত ১২ মার্চ পাস হওয়ার পর সংশোধিত আইনের আলোকে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০১৫ প্রণীত হয়। এতে পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ হয়। পর্যায়ক্রমিক কাজগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একই সঙ্গে আলো আঁধারের বসবাস হয় কীভাবে?

দেশে তামাকের উৎপাদন যে ব্যাপক হারে বাড়ছে, সেটির লাগাম টেন ধরাটাও একটা প্রশ্নের ব্যাপার। কৃষকরা অন্যান্য ফসল আবাদ করে মধ্যস্বত্বভোগী আর অব্যস্থাপনায় যে নামমাত্র যেভাবে লাভবান হোন সেই তুলনায় এই পণ্য আবাদে তুলনামূলক অনেক বেশি লাভবান হয়। তামাকের এই চাষ প্রাথমিকভাবে মানিকগঞ্জে শুরু হলেও সেটি অঞ্চলেই সীমিত থাকেনি। এটা আমাদের আতঙ্ক উদ্বেগের ব্যাপার। এখন বৃহত্তর রংপুরের সাতটি জেলা, কুষ্টিয়া অঞ্চলের চারটি জেলা, নড়াইল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, পার্বত্য অঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কোম্পানিগুলো তামাক চাষে প্রলুব্ধ করছেন। এর ভয়াবহা এমন পর্যায়ে পোঁছেছে যেটি মগজের তরজমায় অবাক হতে হয়। আমাদের কৃষি জমির প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরেও বেশি জমিতে এই তামাক উৎপাদিত হচ্ছে। ইতিহাস পর্যবেক্ষণে যেই ইতিহাস দাঁড়ায় তাতে তামাক আগ্রাসনের ব্যবহার, উৎপাদ ঠেকাতে সকলের নিরলস ভূমিকা পালন করতে হবে। যদিও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছে কাজটি বিশেষত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রণালয়ের তিনটি বিভাগ বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের। বস্তুত আমাদের গণমাধ্যমকর্মী, নাটক নির্মাতা কারিগর, অভিনেতা-অভিনেত্রী সর্বোপরি দেশের সকল সুনাগরিকের মাথায় এই মহান দায়িত্বভার।

একবিংশ শতাব্দীর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি দক্ষ সুস্থ জাতি গঠনে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ঘোষণা মতে ২০৪০ সাল নাগাদ তামাক সেবন শুন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গৃহীত হোক। আগামীর প্রজন্মকে যেন তামাকমুক্ত বাংলাদেশ উপহার দিতে পারি, সেই প্রত্যাশায় আমরা ।

লেখক : অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট (লিগ্যাল)
অরোরা রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ঢাকা

পিডিএসও/হেলাল