করোনা সংকট : ঘরে ও বাইরে নারী

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২০, ১৬:১২

শ্যামা সরকার

নারী। সৃষ্টির গৌরব। কর্মে-চেতনায় স্বতন্ত্র। দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে একনিষ্ঠ। দক্ষতা ও সাহসিকতায় শীর্ষে। নানা প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ঘরে ও কর্মক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী। সমকালীন বিশ্বে নারী নেতৃত্ব বা নারীর চিন্তাধারা অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত। এর সমর্থনে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরাও ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখছেন। তাই যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নারী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

করোনাভাইরাসের মহাসংকট বিশ।বজুড়ে। থমকে গেছে বিশ্ব। বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবেলায় ঘরে ও বাইরে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন ‘দশভূজা নারী’। ‘কর্মই ধর্ম’ এ ব্রত নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তারা। আমাদের দেশের নারীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় নারী চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মীরা তাদের নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছেন। 

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নারীদের যেমন জীবনের ঝুঁকি আছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও আছে। আর এই চ্যালেঞ্জই নারীর শক্তি, কাজের প্রেরণা। করোনাভাইরাসে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে চিকিৎসক ও নার্সরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের ৭০ শতাংশই নারী। আমাদের দেশেও এ সংখ্যা কম নয়। ফলে প্রতিষেধক আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত এ রোগের সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখে রয়েছেন এ খাতের নারীরা। এ অবস্থায় ঘটনা পরিক্রমায় একটি উপমার সাহায্যে আরো সহজ করে বলতে চাই, কাজ শেষে একজন মা যখন ঘরে ফিরে আসেন, সন্তান টের পেয়ে মাকে এসে জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও সন্তানের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে মা তার সংস্পর্শে আসেন না। মা তার কষ্ট চেপে রাখেন কারণ তার সন্তান যেন সুস্থ থাকে। একজন মা-ই পারেন এ ত্যাগ স্বীকার করতে। এ রকম অসংখ্য আত্মত্যাগ নীরবে-নিভৃতে করে যান আমাদের সমাজের নারীরা। তাই পরিবারেও একজন নারীর ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। পরিবারে নারীর বিভিন্ন রূপ। কখনো কন্যা, কখনো স্ত্রী, কখনো জননী। আর এসব ক্ষেত্রেও নারীর ভূমিকা বৈচিত্র্যপূর্ণ। 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে নারী-পুরুষ উভয়কেই ঘরে থাকতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কাঁচাবাজার এবং ওষুধের দোকান ছাড়া বিপণিবিতান, শপিংমল বন্ধ। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে জনজীবন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। যা স্বল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। যেহেতু, সর্বত্রই নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ, সেক্ষেত্রে এ বিপর্যয নারীকেই সামাল দিতে হয়। কারণ, অস্বীকার করার উপায় নেই নারীই ঘর সামলান। সন্তানের লালন-পালন করেন। পুরুষের তুলনায় নারীরাই তাদের শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের যত্ন, দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। একজন কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কর্মজীবী নারী কাজ করেন তিনগুণ। কেনাকাটায় পুরুষের অংশগ্রহণ থাকলেও বর্তমানে কর্মজীবী নারীরাও ঘরের কেনাকাটায় একইভাবে দায়িত্বশীল। পরিবারের শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ সদস্যদের দেখভালের দায়িত্বটাও কর্মজীবী নারীকে নিতে হয়। এসব নির্দিষ্ট কাজের বাইরেও সংসারের টুকিটাকি অন্য কাজে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় বেশি। তবে কর্মজীবী নারীর ঘরের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। তাই এর গুরুতও¡ দৃশ্যমান হয় না। কারণ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটাই স্বাভাবিক চিত্র। 

ঘরের কাজে নারীর পাশাপাশি পুরুষ এগিয়ে আসবে- এ সংস্কৃতি আমাদের সমাজে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী যতোটা অর্থ উপার্জনে এগিয়ে এসেছে, পরিবারের হাল ধরেছে কিন্তু সেই তুলনায় পুরুষ এগিয়ে আসেনি ঘরের কাজে। এ বৈপরীত্যের জন্য সমাজ দায়ী, নাকি পুরুষের মন-মানসিকতা!

এ চিত্রটি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। এটি শঙ্কারই জন্ম দেয়। কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ বিস্তাররোধে ঘরে থাকার কারণে সহযোগিতা নয় বরং নারীর প্রতি বাড়ছে সহিংসতা। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ। যা সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। এটি জাতির জন্য অশনি সংকেত।
আমাদের দেশে প্রতি দুজনে একজন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। যেহেতু এখন বাইরে বেরোচ্ছে না কেউ, তাই দীর্ঘ সময় ঘরে থাকতে হচ্ছে বলে সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে। অর্থনৈতিক টানাপড়েন, চাকরি হারানোর আশঙ্কা, চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ পরিস্থিতি সহিংসতার মূল কারণ। করোনা সংকটের নেতিবাচক প্রভাব যাতে পারিবারিক সহিংসতাকে বাড়াতে না পারে সেদিকে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা প্রয়োজন। 

৬ এপ্রিল ২০২০, ইউএন উইম্যানের নির্বাহী পরিচালক পুমজিলে স্লামবো উকা এক বিবৃতিতে করোনার কারণে লকডাউন চলাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির পরিস্থিতিকে ছায়ামহামারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই দিনে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস এক বিবৃতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য গৃহীত জাতীয় পরিকল্পনায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই ছায়ামহামারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে তা কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে জাতিসংঘ মতপ্রকাশ করে।

যে কোন মহামারী মোকাবেলায় নারীরাই সামনের সারিতে অবস্থান করেন, তেমনি পরিবারের সংকট মোকাবেলায়ও নারীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। এটা নারীর সহজাত প্রবৃত্তি। এতো কিছুর পরেও, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা আজ সচেতন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীর রয়েছে অনবদ্য ভ‚মিকা। শহরের অলিগলির মধ্যেও একজন নারী ছোট্ট একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন, রাস্তার পাশে বসে পিঠা বিক্রি করছেন, রিকশা চালাতেও পিছিয়ে নেই নারীরা, কাঁচাবাজারে সবজি বিক্রেতা, এমনকি হোটেলও চালাচ্ছেন নারীরা। এছাড়া গ্রামের হাজারো নারী গার্মেন্ট শিল্পে, কলকারখানায় যোগ দিচ্ছেন। নারীরা এভাবে কর্মমুখর হয়ে উঠেছেন বলেই আজ তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। যা দেশের অর্থনৈতিক খাতে বিরাট ভ‚মিকা রাখছে। 

আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক হলো নারী। কাজেই নারীদের অবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এ দেশের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন এনজিও নারী শিক্ষার প্রসার ও কর্মসংস্থানের জন্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে। হাঁস-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পÑ এসব কাজে সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। এছাড়া, বেশকিছু এনজিও ও ক্ষুদ্র অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব সম্পদ অথবা দাতা সংস্থার অর্থায়নে হতদরিদ্র, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পরিবারগুলোকে সহায়তা বা সেবা দিয়ে আসছে। আর এ সেবার মূলগ্রহীতা হলেন নারী। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এনজিওগুলো নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাদের সামাজিক পদমর্যাদা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলেছে। একজন উন্নয়ন কর্মী হিসেবে এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

করেনাভাইরাস মহামারীর এই বিপর্যয়ের সময়ে মানসিক চাপ বৃদ্ধি, সামাজিক এবং সুরক্ষা নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সেবার পরিধি সংকুচিত হওয়ার ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নারীদের সেই চাপ আরও বাড়িয়ে তুুলেছে। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় নারীদের একই সঙ্গে অফিস ও ঘরের কাজসহ বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মোকাবেলায় ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে, যা নারীদের শারীরিক ও মানসিক অবসাদগ্রস্ততার ঝুঁকিতে ফেলছে।

করোনাভাইরাস থমকে দিয়েছে বিশ্বকে। এ মহামারী থেকে ঘুরে দঁাঁড়াবে বিশ্ব। প্রকৃতিও ফিরবে তার  নিজস্ব রূপে, প্রতিটি প্রাণ ভরে উঠবে চঞ্চলতায়। ফিরে পাবে নতুন জীবন। পরিবর্তন হবে দৃষ্টিভঙ্গির, জেগে উঠবে বিবেক। মুক্তচিন্তার অধিকারী হবে নারী। এগিয়ে যাবে দেশ ও জাতি।

লেখক : ম্যানেজার (কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ) উদ্দীপন, প্রধান কার্যালয়।