কোভিড-১৯ বিস্তাররোধে সফল নারীদের স্যালুট

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২০, ১৩:২২

শ্যামা সরকার

পরিবর্তনের শক্তিশালী নেতৃত্ব নারী। নারীর বিচক্ষণতা ও সুদূরপ্রসারী ভাবনা নাড়া দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের মূর্ত প্রতীক নারী। সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল। তাই আজ বিশ্ব অঙ্গনে নারীর প্রতিনিধিত্বকে দেখা হচ্ছে নতুন করে। ভাবনায় এসেছে এক অলঙ্ঘনীয় পরিবর্তন।

সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই চলেছে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নারী তার অবস্থানকে আরো শক্ত ও দৃঢ় করেছে। ২০২০ সাল গোটা বিশ্বকে থমকে দিয়েছে করোনভাইরাস, যা কোভিড-১৯ নামে পরিচিত। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়করা করোনাভাইরাসের প্রভাবে দিশেহারা, সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন সরকারপ্রধান নারী এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে নিয়েছেন চ্যালেঞ্জ। সাহসিকতা ও দক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে দেশের নাগরিকদের বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। বিশ^জুড়ে বইছে প্রশংসার ঝড়।  

বিশ্বব্যাপী করোনার বিস্তাররোধে সফল দেশগুলোর মধ্যে একটি বিষয়ই উঠে এসেছে—নারী নেতৃত্ব। এ সংকটময় মুহূর্তে জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃতের হার কমাতে সক্ষম হয়েছে। মহামারি মোকাবেলায় এই সফল নারীদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন। 

সততা  (Honesty) : জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল তার দেশের জনগণকে বোঝাতে পেরেছেন যে, কোভিড-১৯ এটি একটি ভয়ঙ্কর মহামারি। অন্তত ৭০ ভাগ মানুষ এতে আক্রান্ত হবে। তিনি জনগণকে বারবার এটাই বোঝাতে চেয়েছেন, এটি গুরুতর। এটিকে আপনারা গুরুত্বসহকারে নিন। যদিও কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর হার জার্মানিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। 

করোনাভাইরাসকে ‘গুরুত্ব’ সহকারেই নিয়েছে জার্মানি। এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা তথ্য  গোপনের কোনো অভিযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা কম  এবং মহামারী নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। পরিসংখ্যান বলছে, খুব শিগগিরই জার্মানিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। এ কারণে মেরকেল শপিংমল এবং স্কুল পুনরায় চালু করার সাথে সাথে সীমিত আকারে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেয়ার পর সম্প্রতি দেশটিতে আবারো বেড়েছে সংক্রমণের হার। 

সংকল্প (Determination) : করোনা মহামারি মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান অন্যতম। জানুয়ারি মাসের শুরুতেই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের ঘোষণা না দিয়ে আক্রান্তদের চিহ্নিত করে আলাদা করাসহ ১২৪ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে তাইওয়ানের উদ্যোগকে ‘করোনা মোকাবেলায় বিশ্বে শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

লকডাউন ছাড়াই কঠোর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে করোনা নিয়ন্ত্রণে এনেছে তাইওয়ান। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি ফেস মাস্ক সরবরাহ করেছে দেশটি।

কর্ম (Action) : করোনা সংক্রমণরোধে দক্ষ নেতৃত্বের জন্য ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ্যার্ডেন। তার নেতৃত্বে সংক্রমণের শুরুতেই দেশটিতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়।

করোনার ভয়াবহতা ও লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জাতিকে বোঝাতে সফল হয়েছেন তিনি। আর এ কারণেই জনগণ তার নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলেছে। দেশটিতে ৬ জন আক্রান্ত হওয়ার পর পরই বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে বিদেশি যাত্রীদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

সঠিক নির্দেশনার কারণেই নিউজিল্যান্ড মারাত্মক পরিণতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে করোনায় ২১ জন মৃত্যুবরণ করেছেন, মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ১৪৪ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৩৭১ জন।

আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করলেও দেশটির সীমান্তে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যার্ডেন। নিউজিল্যান্ডের নাগরিকরা দেশে ফিরতে পারছেন। তবে ফেরার পর বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে।

নতুনত্ব (Innovation) : সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত রেখেছে ফিনল্যান্ড। গত ডিসেম্বর দেশটিতে নির্বাচিত হয়েছেন বিশ্বে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী সানা মেরিন। নেতৃত্বে আসার পর পরই করোনাভাইরাস সংকট মোকাবেলায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

দেশের সব মানুষ সংবাদপত্র না পড়লেও অধিকাংশ মানুষই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকে বলে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন ক্যাম্পেইন শুরু করেন তিনি। 

প্রযুক্তির ব্যবহার (Tech-Savvy) : দেশের সকল নাগরিকের বিনামূল্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করেছে আইসল্যান্ড। অধিকাংশ দেশ উপসর্গ দেখা যাওয়ার পর করোনার পরীক্ষা করলেও ব্যতিক্রম আইসল্যান্ড। প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন ইয়াকোবস্টডিটির নেতৃত্বে দেশটিতে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা জানতে ঝুঁকিতে থাকা সকল মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। জনসংখ্যার অনুপাতে দেশটি ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি মানুষের করোনা পরীক্ষা করেছে। আক্রান্তের সংস্পর্শে আসাদের খুঁজে বের করতে প্রযুক্তির সাহায্যে শক্তিশালী ব্যবস্থা চালু করেছে। অন্যান্য দেশের মতো আইসল্যান্ডে লকডাউন হয়নি এমনকি স্কুলগুলোও বন্ধ করা হয়নি।

জনগণের প্রতি ভালোবাসা (Compassion) : ঘরবন্দি শিশুদের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে বিশ্বে প্রথম শিশুদের জন্য বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এর্না সোলবার্গ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ওই সংবাদ সম্মেলনে কেবল শিশুরাই ফোন করতে পারবে। সম্মেলনে সারা দেশের শিশুদের সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। আতঙ্কে থাকা শিশুদের অনুপ্রেরণা ও সচেতন করে তুলতে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।

দূরদর্শিতা (Vision) : ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসন এপ্রিলের শুরুতে কোপেনহেগেনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশ যে মহামারী মোকাবেলা করে চলেছে তাদের তুলনায় আমরা ওই সংকটময় মুহূর্ত পার করতে সক্ষম হয়েছি। 

১০টির বেশি গ্রুপে লোক ধরা পড়লে পুলিশকে জরিমানা জারি করার নির্দেশ দেয়া হয়, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চুরি করা হলে অভিবাসীদের বহিষ্কার করা হতে পারে কিংবা এ ধরনের অপরাধের জন্য কারাভোগও করতে পারে বলে গত মার্চ মাসে ডেনিশ সরকার একটি আইন পাস করে। এ কঠোর পদক্ষেপের কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ডেনমার্ক ও বিশ্বজুড়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে। তবে আশার কথা হলো- এর কারণে প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ তার এ মতামতকে সমর্থন করে। ডেনমার্ক শিগগিরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করবে বলে আশা করেন প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসন।

ফোর্বস ম্যাগাজিনে সফল নারী নেতৃত্বের তালিকায় শেখ হাসিনা : করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিনে সফল নারী নেতৃত্বের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ম্যাাগাজিনটি জানায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বাংলাদেশে, তা এখনো কার্যকর করতে পারেনি যুক্তরাজ্য।

এর আগে করোনা মোকাবেলায় নারী নেতৃত্বে সফলতা বেশি আসছে বলে এক প্রতিবেদনে জানায়  ফোর্বস ম্যাগাজিন। তখনও করোনার সংক্রমণ বাংলাদেশে সেভাবে দেখা যায়নি। এ সময় ৬ জন নারী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নতুন করে ৮ নারী নেতৃত্বের নাম  ঘোষণা করা হয় যেখানে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ভূয়শী প্রশংসা করে। এ ম্যাগাজিনে আরো উঠে আসে ১৮ কোটির মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। সেখানে দুর্যোগ কোন নতুন ঘটনা নয়। আর এই করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ভুল  দেশটির প্রধানমন্ত্রী। তার এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম বিষয়টিকে ‘প্রশংসনীয়’ বলে উল্লেখ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই চীনে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মার্চের শুরুতে প্রথম সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন। তিনি দেশের সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে করোনা রোগী শনাক্ত করতে স্ক্রিনিংয়ের জন্য মেশিন ব্যবহার করার নির্দেশ দেন যেখানে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছে (এদের মধ্যে ৩৭ হাজার মানুষকে দ্রুত কোয়ারেন্টাইনে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়), যা এখনো যুক্তরাজ্য কার্যকর করতে পারেনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি এ তালিকায় আরো রয়েছেন বলিভিয়ার নেতৃত্ব দেয়া জেনাইন অ্যানেজ, ইথিওপিয়ার সাহলে-ওর্ক জেওডে, জর্জিয়ার সালোমেজ জওরাবিচভিলি, হংকংয়ের ক্যারি লাম, নামিবিয়ার সারা কুগংগেলোয়া, নেপালের বিদ্যা দেবী বান্দ্রে এবং সিঙ্গাপুরের হালিমাহ ইয়াকব।

কোভিড-১৯ কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি আমাদের সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এক বিরাট ধাক্কা। এ ক্ষতি অপূরণীয়। তথাপি এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে নারী সরকারপ্রধানরা মতপ্রকাশ করেন।   

এছাড়া জাতিসংঘের উইমেনের লক্ষ্যএ সংক্রমণ মোকাবেলায় কীভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে সে সম্পর্কে গাইডলাইন অনুসরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি এবং এর প্রভাব হ্রাস করা। 

শুরুতেই বলার চেষ্টা করেছি, পরিবর্তনের শক্তিশালী নেতৃত্ব নারী। চিন্তা-চেতনায় রয়েছে বৈচিত্র্যও। তাই বলা যায়, এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে নারী নেতৃত্বের সাফল্য জেন্ডার সমতা, বিশ্ব জনস্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। স্যালুট! বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবেলায় অগ্রগামী সফল নারী সরকারপ্রধানদের।

লেখক : ম্যানেজার (কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ)
প্রধান কার্যালয়, উদ্দীপন

পিডিএসও/হেলাল