কেন দেশটাকে বিপদের দিকে ঠেলে দিলি?

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১১:৫৫ | আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ১৪:৪৬

আমাদের সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। আমি দেশের কথাই বলছি। করোনাভাইরাস যে এই দেশেও তাণ্ডব চালাবে এটা জানা কথা। আমরা পৃথিবীর বাইরে নই। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশটা একটু ভিন্ন। ভিন্ন বললাম এই কারণে, আমরা যে বাঙালি। আমি আগেও বাঙালির যে দুই নম্বরি চিন্তা বেশি-এর উপরে এটা লেখা লিখেছিলাম। আর প্রশ্নবিদ্ধ বললাম তারও যথাযথ ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে। 

বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর আবির্ভাব ঘটেছিল ৮ মার্চ। যিনি প্রথম আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন ইতালিফেরত। অর্থাৎ প্রথম চীনের উহানে করোনাভাইরাস এর উৎপত্তি হওয়ার পর এই ভাইরাস আপনাআপনি কিংবা বাতাসে ভেসে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে গিয়ে পৌঁছায়নি। কেউ না কেউ ভাইরাসটাকে বহন করে নিয়ে গেছেন। যখন এইভাবে অন্যান্য দেশে ভাইরাসটা বংশ বিস্তার করছিল দ্রুত তখন আসলে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম? যদি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে আমরাও ভুল করেছিলাম। একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই তাহলে দেখবো, আমাদের দেশে ৮ মার্চের পরপর দেশ লকডাউন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, কারফিউ জারি- এইসব রব উঠেছিল। কিন্তু কয়েকটা দিন নিশ্চিন্তে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী বেশ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কথাও বলেছিলেন। এমন কথাও শোনা গিয়েছিল- আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী। 

আমরা গত মাসের ১৫ তারিখের দিকে এসে প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা পেলাম। ততদিনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণঘাতী সেই ভাইরাস বহন করে অনেকে দেশে প্রবেশ করেছে। তাদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছে বিমানবন্দর কতৃপক্ষ। সেইসময় এমনও দেখা গেছে যাদের ভিতরে করোনার লক্ষণ, তাদের পরীক্ষার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে তারা অথবা তাদের কেউ বিদেশফেরত কিনা। যদি প্রবাসী কিংবা প্রবাসী আত্মীয়-স্বজন না থাকে তাহলে তাদের পরীক্ষা করার দরকার নেই। এখানেই আমরা বড় মুর্খতার পরিচয় দিয়েছি। অজান্তে ভাইরাসটাকে ছড়াতে দিয়েছি।

আমরা দেশের সব বিমানবন্দর আগেই লকডাউন করে দিইনি। অবাধে দেশে এসেছে হাজার হাজার প্রবাসী। আর আমরা বাঙালি এতটাই খারাপ, যারা প্রবাসী তারা কেউ কোয়ারেন্টাইন মানিনি। তার চেয়ে ভয়ংকর কথা, প্রবাসীরা প্রতিবাদ করেছে কোয়ারেন্টাইনে থাকবে না বলে। তাহলে তোরা দেশে এলি কেন? কেনও নিজের দেশটাকে বিপদের দিকে ঠেলে দিলি? তোরা সচেতন হলে তো দেশের এই পরিণতি হতো না। এতে করে ফলটা কি হয়েছে? দিন দিন বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। আমার কাছে অনেকেই প্রবাসীদের নিয়ে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, সরকার কেনও প্রবাসীদের দেশে ঢুকতে দিল? কেনও শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়নি? এইসব প্রশ্নের উত্তর সরকারই দিতে পারবে।

গতকাল (শুক্রবার) পর্যন্ত সরকারি হিসেবে দেশে করোনায় আক্রান্ত ১৮৩৮ জন আর মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জন। এই সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এখনো জানিনা, আজকে এই সংখ্যা কতো হতে পারে?  আর করোনা আক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে দেশেও দফায় দফায় লকডাউন হচ্ছে এক একটা জেলা-উপজেলা। 

আরও আগে একবারেই কি দেশটাকে লকডাউন করা যেত না? যারা কোয়ারেন্টাইন মানছেন না তাদের বিরুদ্ধে কি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যেত না? সেদিন প্রথম একজন চিকিৎসক করোনায় মারা গেলেন। কথা হচ্ছে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য আমরা কি শুরু থেকে কোনও ব্যবস্থা নিয়েছিলাম?

এমন ক্রান্তিলগ্নে বাঙালি সবচেয়ে খারাপের প্রমাণটা তখনই রাখছে যখন চুরি অব্যাহত রেখেছে। চুরি বিদ্যা যে মহাবিদ্যা তার নমুনা কিন্তু আমরা দেখিয়েই যাচ্ছি সমানতালে। আর এই চুরিটা করছে কিনা জনপ্রতিনিধিরা। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন ত্রাণ চোরদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সেখানে তার নির্দেশ অমান্য করে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে চোররা। কেউ মাটির নিচে, কেউ খড়ের গাঁদায়, আর কেউ বক্স খাটের ভিতর। যে যা পারে, যেভাবে পারে চুরির মাল মজুদ করছে। সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চুরিতে মেতেছে তারা। তাদের মনে করোনার ভয় নেই। তারা দুর্যোগের সুযোগে ভবিষ্যতের জন্য আখের গোছাচ্ছে।

সচেতনতার প্রশ্ন তো থেকেই যায়। এখনও অলিতে গলিতে, বাজারে ভিড় চোখে পড়ে। মানুষ মানছে না সামাজিক দূরত্ব। অনেকে গায়েও মাখছে না। তবে এটা সত্যি, বেশিরভাগ মানুষ পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছে। ক্ষুধা মানুষকে মৃত্যুভয় ভুলিয়ে দেয়। মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। এইসব মানুষের আহারের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। তাদেরকে ঘরে থাকতে বাধ্য করলে তাদের ঘরেই খাবারটা পৌঁছে দিতে হবে। অন্যথায় তারা আইন মানবে না। এমন যেন না হয়, করোনার চেয়ে অনাহারে মানুষ মরছে বেশি। আমরা এমন দিন দেখতে চাইও না। যাদের ঘরে খাবার নেই, তাদের পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। 

সঙ্গে বাড়াতে হবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা। মানুষকে ঘরে থাকার নিরাপত্তা যেমন দিতে হবে তেমনি অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিরাপত্তাও দিতে হবে। আমরা আমেরিকার মতো পরিণতি চাই না। যেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। সেই অবস্থা আমাদের হলে, সবাই একবার ভাবুন। 

লেখক : নাট্যকার, সাহিত্যিক ও প্রতিদিনের সংবাদের অনলাইন ইনচার্জ