করোনা প্রতিরোধে সতর্কতার বিকল্প নেই

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২০, ১১:১৮

রায়হান আহমেদ তপাদার

সারা বিশ্ব আজ অসহায় রহস্যময় অদ্ভুত এক ভাইরাসের হাতে যেন বন্দি হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে মানুষ নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। যা জীবনেও কল্পনা করেনি তা স্বচক্ষে অবলোকন করছে। হঠাৎ করে পৃথিবীর বৈরী আচরণ মানুষকে কী সংকেত দিচ্ছে? বৈশ্বিক যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে তাতে হলফ করে বলা যায় পৃথিবী ইউটার্ন দিয়েছে। গ্লোবাল যে দুর্ভিক্ষ ঘটতে যাচ্ছে তা আদৌ কি প্রতিহত করা সম্ভব? থমকে গেছে পুরো বিশ্ব।

যাই হোক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বাংলাদেশে যে সতর্কতামূলক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। দৈনিক নিউজ পেপার থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব জায়গাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কীভাবে নিজেকে এই ভাইরাস থেকে রক্ষা করবেন। সে ব্যাপারে প্রতিনিয়ত যে পরামর্শ ও সচেতনতার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে তা মেনে চললে আক্রান্তের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস ক্রমেই মহামারির আকার নিচ্ছে। লাফিয়ে বাড়ছে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা। আক্রান্ত হতে বাদ নেই ইউরোপ, আমেরিকাও। বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে ভাইরাস। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও। ভাইরাসটির প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। এরপর থেকে প্রতিদিনই শত শত মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি। ইউরোপে পর্যটক ঢোকায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, করোনা আতঙ্কে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ার বাজারে দরপতন অব্যাহত আছে। বাজারে প্রচণ্ড অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নতুন করোনাভাইরাসের ব্যাপক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চাইলে জরুরিভিত্তিতে আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে এদিকে কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বরিস সরকার যুক্তরাজ্যের জীবনযাপনে সব সামাজিকতা নিষিদ্ধ করেছে। ৭০ বছরের বেশি বয়সি লোকজনকে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ক্যাফে, পাব, সিনেমা হলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসে মহামারির প্রকোপ কমিয়ে আনতে সন্দেহভাজন রোগীদের পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সঙ্গে সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। পৃথিবীর মানুষ শঙ্কায় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, প্রতিদিন পাল্টে যাচ্ছে করোনাভাইরাসের তথ্যচিত্র। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে নতুন সংক্রমণের খবর। মানুষের প্রাণ হারানোর সংখ্যাও বাড়ছে। এটা বৈশ্বিক মহামারি। এমতাবস্থায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সাময়িক বন্ধ করছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। বাতিল করা হচ্ছে বিশ্বনেতাদেরও পররাষ্ট্র সফর। খেলার মাঠে খেলোয়াড়রা করমর্দন করা থেকেও বিরত আছেন বলে সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় পৃথিবী যেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিয়েছে নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। ফেসবুক তাদের লন্ডন কার্যালয় সাময়িক বন্ধ রেখেছে। বাড়ি থেকেই কর্মীদের কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে করোনার সংক্রমণ শুরু। এরপর ১৪৭টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস। মারা গেছেন ৫ হাজারেরও বেশি। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গণপরিবহন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর। করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ভাইরাস চূড়ান্তভাবে আঘাত করলে বিশ্বের অর্থনীতিতে বছরে উৎপাদন কমবে ৩৪ হাজার ৬৯৭ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৯ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর প্রভাবে উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশে রফতানি বাণিজ্য কমবে। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে। কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় কমে যাবে শিল্পোৎপাদন। এর ফলে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। অর্থনীতির ওপর করোনার প্রভাব সম্পর্কিত জাতিসংঘের ও এডিবির পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি ছয় মাসের বেশি অর্থাৎ তীব্র আকার ধারণ করলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে ৯৪ লাখ ডলার বা ৮০ কোটি টাকা লোকসান করবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিমান, হোটেল ও পরিবহন খাত। এসব খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ হবে ভয়াবহ। কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের শীর্ষ ২০ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের চামড়া, পোশাক ও আসবাবপত্র শিল্প খাত বড় ক্ষতির মধ্যে পড়বে। করোনাভাইরাসে দেশের শেয়ার বাজারে আঘাত দৃশ্যমান হয়েছে। ৯ বছরে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে সর্বোচ্চ পতন হয়েছে। পণ্য ও গণপরিবহন অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ায় পৃথিবীর অনেক প্রান্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও মজুদ সংকট দেখা দিয়েছে। কাতার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ থেকে কেউ তার দেশে ঢুকতে পারবে না। এতে সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের শ্রমিকরা যারা কাতার থেকে দেশে ছুটিতে গিয়ে আটকা পড়েছেন। সব মিলিয়ে সারা বিশ্বের অবস্থাই এখন ভীতিকর। সৌদি আরবে ওমরাহ হজ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। দেশে করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ায় স্বভাবতই মানুষের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের ভীতি বা আতঙ্ক কাজ করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মানুষ সতর্ক থাকলে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং আতঙ্কগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের প্রাদুর্ভাব যেহেতু পৃথিবীতে নতুন তাই এ রোগ মোকাবিলা করারও পূর্বপ্রস্তুতি বা অভিজ্ঞতা নেই বাংলাদেশের। একসময় ঝড়, সাইক্লোন ও বন্যায় বাংলাদেশের অনেক মানুষের প্রাণহানী ঘটত, কিন্তু এখন বাংলাদেশের মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুহার কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকার মৃত্যুহার বেশি। তবে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

তাই আতঙ্কিত না হয়ে আমরা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকি। করোনা কীভাবে ছড়ায় তার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, যেমন হাঁচি ও কাশির ফলে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে, ভাইরাস আছে এমন কোনো কিছু স্পর্শ করলে, হাত না ধুয়ে মুখে, নাকে বা চোখে লাগালে এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে এবং করোনাভাইরাসের লক্ষণের কথাও জানা জরুরি, যেমন-সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, মারাত্মক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া শিশু, বৃদ্ধ ও কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিস। এমনকি করোনাভাইরাস প্রতিরোধের প্রতিও সচেতন হতে হবে, যেমন মাঝে মাঝে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ না করা, হাঁচি, কাশি দেওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা, বন্যপ্রাণী বা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ না করা, মাংস বা ডিম খুব ভালোভাবে রান্না করা, মুখে মাস্ক ব্যবহার করা, প্রচুর ফলের রস ও পানি পান করা ইত্যাদি। করোনাভাইরাস থেকে সচেতনতা বাড়াতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। কোভিড-১৯ যা করোনাভাইরাস নামে পরিচিত সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এশিয়ার বিভিন্ন অংশ এবং এর বাইরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করে আপনি এই ভাইরাসটির সংক্রমণ ও বিস্তারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারেন। যেকোনো বয়সের মানুষই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

আগে থেকে অসুস্থ বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস মারাত্মক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে শহরাঞ্চলের দরিদ্র শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। এসব প্রভাবের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, যা সম্প্রতি মঙ্গোলিয়ায় দেখা গেছে। এই করোনাভাইরাসটি ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের ওপর এই ভাইরাসের প্রভাব বা এতে কতজন আক্রান্ত হতে পারে—সে সম্পর্কে আমরা এখনো বেশি কিছু জানি না। কিন্তু নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। সময় আমাদের সঙ্গে নেই। বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা দেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নিউইয়র্কের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। চলতি সপ্তাহে জ্যাকসন হাইটসে ডাক্তারবাড়ি ডটকমের আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এমন আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, যেহেতু ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়ায় এবং এর প্রতিষেধক কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই সতর্ক হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই মুহূর্তে এই ভাইরাসের মাধ্যমে দেখা দেওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকি গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ব্যাপারে এরই মধ্যে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভাইরাসটিকে মোকাবিলা করতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা আর সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

সর্বাধিক পঠিত