শেখ হাসিনার প্রশংসনীয় উদ্যোগ

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২০, ০৮:৪২

রায়হান আহমেদ তপাদার

বঙ্গবন্ধুর জন্মের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তার জন্ম না হলে আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব হতো কি নাসেই মৌলিক প্রশ্নের কোনো অনুমানভিত্তিক সদুত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তার জন্ম হয়েছিল বলেই তারই নেতৃত্বে একটি আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে—এটি ইতিহাসের চরম সত্য। সে কারণে বঙ্গবন্ধুকে এই রাষ্ট্রের জনক ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমাদের চিরকাল স্মরণ করতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহানায়ককে নতুন প্রজন্মের অন্তর্দৃষ্টি ও চোখের দৃষ্টিতে তুলে ধরা, উপস্থাপন করার মাধ্যমে নেতার প্রকৃত সৌম্য দেহ, অদম্য সাহস, তেজোদীপ্ত পদচারণে, সীমাহীন দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি অসীম ভালোবাসা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শোষণহীন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন কীভাবে রেখে গিয়েছিলেন, সেটি তুলে ধরাই হতে পারে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের মূল উদ্দেশ্য।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজের মৌলিক বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ভূমিহীন মানুষকে ভূমি এবং অন্যটি হচ্ছে গৃহহীন মানুষকে ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বারবার উচ্চারণ করেছিলেন। রেকর্ড করা তার ভাষণের যেসব অংশ এখন আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কল্যাণে শুনতে পাই, তাতে তার মুখ থেকেই ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের প্রতি তার দরদ ও ভালোবাসার কথা উচ্চারিত হতে শুনি। এটি শুধু বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতার আবেগি বিষয় ছিল না, এটি ছিল তার একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা যেখানে প্রতিটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সার্থকভাবে পালন করা উচিত আমাদের নিজেদের স্বার্থেই, যাতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারি আমরা। আর সে আদর্শকে ধারণ করে আগামী দিনে আমাদের দেশের নেতৃত্ব দিতে পারে তারা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহামানব, যাকে অনুসরণ করা যায়। যাকে অনুসরণ করলে দেশ, জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তিসবারই কল্যাণ হয়। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি একদিকে ছিলেন কৃষক, শ্রমিকের প্রাণপ্রিয়। অন্যদিকে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ছিলেন দক্ষ সংগঠক। হালকা কথা বলে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। এই পর্বতসমান মানুষটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন ছোটবেলা থেকে। জীবনের শেষ দিন যখন গুলি করতে এসেছে, তখনো বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছেনতোরা কী চাস? শতবর্ষ উদযাপনে অন্যায়ের প্রতিবাদ যারা করবেন, তারাই বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অনুসারী। তিনি আমাদের স্বাধীন দেশ দিয়েছেন। পতাকা দিয়েছেন। আত্মমর্যাদা দিয়েছেন। তিনি অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে একটা রাষ্ট্রকে প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। বিশ্বের অগণিত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বঙ্গবন্ধু। সে প্রতিনিধিত্ব তিনি আজও করবেন এবং অনন্তকাল পর্যন্ত করবেন। আজকে আমাদের অনেক অর্জন হয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই প্রশংসার দাবিদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ও আদর্শের উত্তরসূরি জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ সমতার ক্ষেত্র প্রসারিত করলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান পায়। তিনি সংবিধানে মৌলিক চাহিদার কথা উল্লেখ করে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। এজন্য তিনি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। মুজিববর্ষের মধ্যে দেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের নিজের এলাকায় খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, যাদের ঘর নেই তাদের আমরা ঘর করে দেব। আমরা চাই একটা মানুষও যাতে গৃহহারা না থাকে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ, আমার এ কথাটা দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। আপনারা চেষ্টা করেন ঘর করে দিতে। না পারলে আমরা টাকা দেব ঘর করার জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, কোনো আধুনিক রাষ্ট্র মৌলিক এই পাঁচ শর্ত পূরণ ছাড়া নাগরিকের অধিকার বাস্তবায়ন করতে পারে না, রাষ্ট্রও সব নাগরিকের হয়ে ওঠে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তো কতিপয় মানুষের নয়, সব মানুষের জন্যই। বঙ্গবন্ধু সব মানুষের তথা নাগরিকের জন্যই বাংলাদেশ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিকল্পনার পথে চলেনি দীর্ঘদিন। ফলে দেশে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করার কোনো নীতি কার্যকর ছিল না। বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো সরকার কিছু কিছু গুচ্ছগ্রাম বা নদীভাঙা মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দারিদ্র্যবিমোচন নীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে কোনো সরকার করেনি। ফলে বাংলাদেশে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ ভূমিহীন প্রান্তিক সীমানায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে এবং তাদের অনেকেই গৃহহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এ ছাড়া অসংখ্য মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরের বস্তিতে এসে আশ্রয় নিচ্ছে, আবার নদীভাঙা মানুষ উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সতেরো কোটি মানুষের এই দেশে এখনো ভূমিহীন ও গৃহহীন, আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অথচ বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এমন অবস্থায় আমাদের গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের থাকা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কতটা জরুরি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত এক দশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে অনেকখানি অগ্রগতি লাভ করেছে, আশ্রয়ণ, গুচ্ছগ্রাম ইত্যাদি প্রকল্পের অধীন বিরাটসংখ্যক মানুষের থাকা ও জমি পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও সমাজে হতদরিদ্র, ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের উপস্থিতি একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। সে কারণেই শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালনে এমন একটি কর্মসূচির কথা তার দলের নেতা ও কর্মীদের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন, যা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ হিসেবে তিনি মনে করেন। সে কারণে তিনি তার দলের নেতাকর্মীদের সম্মুখে এই বছর এমন একটি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, যেটি করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পন্ন হতে পারে। এ কাজটি শুধু রাষ্ট্রের অর্থায়নে হবে বা করতে হবেএমনটি নয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই রয়েছেন, যারা নিজ নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কাজটি করতে পারেন। সেটিই তিনি পরোক্ষভাবে তার দলের নেতাকর্মীদের বলেছেন। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাবে।

মনে রাখতে হবে, গৃহহীন ও ভূমিহীন সব মানুষ যদি আমাদের উন্নয়ন ধারায় যুক্ত হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গঠনের লক্ষ্য অর্জনে অনেক বেশি কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারবেএতে কোনো সন্দেহ নেই। শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষদের জন্য যদি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে ব্যবস্থা নিতে চান, তাহলে সরকারি প্রশাসনকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে কাজটি সমাপ্ত করলে অনেক বেশি ত্রুটিমুক্ত হতে পারে। দলীয়ভাবে কেউ কোথাও কোনো উদ্যোগ নিলে সেটি দল বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের মূল্যায়ন করতে পারে, দলে তাদের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে। সেভাবেই দলীয় নেতাকর্মীদের কাজের মূল্যায়ন হতে পারে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলায় পরিণত করতে এভাবেই হয়তো অগ্রসর হতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত অবদান রাখার উদ্যোগে অংশ নেবে, নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় বসে থাকবে? সরকারি উদ্যোগে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কতটা সততার সঙ্গে পালন করবেন, সে সম্পর্কে সন্দেহমুক্ত হওয়া বেশ কঠিন। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সততার অভাব নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তাতে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনরা কতটা লাভবান হবেন, নাকি স্থানীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতি করার নতুন উৎস বের হয়ে আসবে, সেটিও মস্ত বড় জিজ্ঞাসার বিষয়।

বঙ্গবন্ধুর মন এবং মানস নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষ বোসএই দুজনের মন ও মানস নিজের মধ্যে লালন করতে পেরেছিলেন। যার ফলে দেশের মানুষের ভালোবাসায় একজন শেখ মুজিব থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধু পুরো জাতিকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভালোবেসে সুইজারল্যান্ডের মতো একটি দেশ উপহার দিতে চেয়েছিলেন। আর আজকের বাংলাদেশ খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। জাতির পিতার স্বপ্নই আমাদের বাংলাদেশ। আইনের শাসন এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরে এলে দেশ এগিয়ে যাবে। এই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা চলছিল। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনই ছিল বাঙালির মুক্তি, মানুষের মুক্তি। বঙ্গবন্ধুরও স্বপ্ন ছিল। তার স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলার। সোনার বাংলার রূপটাও দেখিয়েছেন। সোনার বাংলা হবে শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী উজ্জীবিত একটা দেশ। তিনি না থাকলে আমরা আজ এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল