অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা চাই

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:০৪

সম্পাদকীয়

কথায় আছে, সন্তান না কাঁদলে মাও দুধ দেন না—বাক্যটির ব্যাখ্যা দুইভাবেই করা যায়। একটা নেতি যদিও তা সর্বসমর্থিত নয়। অপরটি বিজ্ঞান বিবেচনায়। তবে আজকের আলোচ্য বিষয়টি মা ও শিশুর বৃত্তে বৃত্তায়িত নয়। বিষয়টি দেশ বা রাষ্ট্র ও জনগণের বৃত্তে বৃত্তায়িত। এখানে একটু বলে রাখা ভালো, এ দুয়ের মাঝে একটা সিমিলি বিদ্যমান। আর সেটি হলো, দেশ ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্কটাও মা ও সন্তানের সম্পর্কের মতো। আর সে কারণেই আমাদের এই আগাম কান্না। আমরা চাই না, আসছে মৌসুমের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির সংখ্যা যেন কোনোভাবেই গতবারের সংখ্যাকে অতিক্রম না করে।

আমরা আশা করতেই পারি, প্রাণহানির সংখ্যা যেন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সরকার এবং প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, অগ্নিকা- প্রতিরোধে আপনারা আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সন্তানের এই কান্নার ধ্বনি রাষ্ট্রকে তার কাজে এগিয়ে আসার প্রশ্নে উদ্বেলিত করবে।

মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ফ্ল্যাট বাসার বদ্ধঘরে জমে থাকা গ্যাসে, চুলা কিংবা গ্যাস লাইনের পাইপের ছিদ্র থেকে নির্গত গ্যাসে এবং শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে অহরহ। আবার কল-কারখানার অনিরাপদ বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনা অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলিন্ডার ও ঘরের এসি বিস্ফোরণেও প্রাণহানি ঘটছে। এ দেশে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসতর্কতার কারণে এবং সরকারি সেবা সংস্থার নজরদারির অভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। গত বছর ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় বেশ কিছু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার ভয়ংকর স্মৃতি এখনো বহন করছেন স্বজনরা। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ১৩৮ জন। দগ্ধ হয়েছে ১৪ হাজার ৯৩২ জন। অগ্নিকাণ্ডের কারণে ৩৩০ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৪ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

দেশের ইতিহাসে আলোচিত কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২০১৯ সালে। পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের কারখানায় আগুনের ঘটনা পুরো জাতিকে বিস্মিত করেছে। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারিতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় ৭৮ জন। ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনে পুড়ে মারা যায় ২৬ জন। বছরের শেষ দিকে ১১ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের প্রাইম প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ২১ জন। ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুর সদরের কেশোরিতা এলাকায় লাক্সারি ফ্যান কোম্পানি লিমিটেডের কারখানায় আগুন লেগে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে নিহত ২১৩৮ জনের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসেই মারা যায় সর্বোচ্চ ২৭৮ জন।

তথ্য মতে, দেশের বহুতল ভবন ও কল-কারখানাসহ বাণিজ্যিক ভবনগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশেই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। তদারকির ব্যবস্থাও তথৈবচ। এ ছাড়া বেশির ভাগ ভবনই পুরোনো। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে। আমরা মনে করি, সচেতনতা বৃদ্ধিই পরিত্রাণের অন্যতম প্রধান পথ। আর এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগও জরুরি। শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি একমাত্র সমাধান নয়, আইনকেও কঠোরভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল