দূষণ ঠেকানো আজ সময়ের দাবি

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০১

সম্পাদকীয়

‘দ্য স্টেট গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ বলেছে, গত রোববার সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় ঢাকা-ই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইপিএর হিসাব মতে, কোনো একটি শহরের বায়ু মানের সূচক ২০০-এর অধিক হলে তাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। গত এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় বায়ুর মান ছিল ২৯৮, যা মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর।

ঢাকা মহানগরজুড়ে বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বয়স্ক ও শিশুদের নাক, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের অসুখ। হাসপাতালে রোগীদের চাপ বাড়ছে। রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসা এক শিশুরোগীর মা মাসুমা জানিয়েছেন, ধুলার কারণে সর্দি-কাশি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তার দুই বছরের শিশু সন্তানের শ্বাসকষ্টও বেড়ে গেছে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, সেপ্টেম্বর চেয়ে অক্টোবরে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা অনেকটাই বেশি। চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনেই হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ৭১৬ জন। নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে বেড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলেছেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশু ও বয়ষ্করাই বেশি ঝুঁকিতে। তবে রোগীদের মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যাই বেশি।

বাতাসে মিশ্রিত সালফার, সিসা, দস্তা ও কার্বনসহ অন্যান্য ধাতবকণা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যে ক্ষতিকর- তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে শিশুদের জন্য। এখানে না বললেই নয় যে, সার্বিক দূষণের জন্য মানবসৃষ্ট কারণগুলোই দায়ী। আমরা জেনে-শুনেই আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার পথে পা বাড়িয়েছি এবং তা অনেকটাই নেতিবাচক বাসনা পূরণের বশবর্তী হয়ে। সমীক্ষা বলছে, প্রাকৃতিক পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বছরে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার দুই-তৃতীয়াংশই বায়ুদূষণের ফলে।

বায়ুদূষণের কারণে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসারকে বেগবান করে। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলক বিচারে অনেকটাই বেশি। বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে মৃতের সংখ্যাগত দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। ২০১৭ সালে এ দেশে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ শুধু বায়ুদূষণের কারণেই মারা যায়।

আমরা মনে করি, বায়ুদূষণের হাত থেকে জাতি ও রাষ্ট্রকে রক্ষা করার শেষ সম্ভবত সময় আজ এবং এই মুহূর্ত। আর সে দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। দেশে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের এবং সর্বাগ্রে এ দায়িত্ব নাগরিকের উপরেই অর্পিত হতে বাধ্য। আমরা নিজেরাই যদি সচেতন না হই তাহলে সরকারকে সচেতন করার কোনো অধিকার আমাদের থাকতে পারে না। তাই আসুন, প্রথমে আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অতঃপর সরকারকে বলি, তোমরা সচেতন হও এবং দেশ থেকে সব অপকর্ম দূর করে রাষ্ট্রকে দূষণমুক্ত করো। আমরা একটি দূষণমুক্ত বাংলাদেশ চাই।

পিডিএসও/তাজ