সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে, বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১২:১৮ | আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৪৫

সম্পাদকীয়

প্রকৃতির ওপর মানুষের ব্যবহারে ক্ষিপ্ত পৃথিবী। ভোগবাদী চিন্তার ধারক-বাহকদের নেতিবাচক চিন্তা বাস্তবায়ন করার কারণে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে ভূ-প্রকৃতি। আর সে কারণেই বাড়ছে সমুদ্রের উচ্চতা; যা মানবসভ্যতার জন্য একটি অশনিসংকেত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে দিন দিন। আর এই উচ্চতা যতই বাড়বে, ততই প্লাবিত হবে বিশ্বের নিম্নাঞ্চল। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চলগুলো।

ঝুঁকির মধ্যে অনেক দেশের নাম থাকলেও শীর্ষে অবস্থান করছে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। গত সোমবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত ৩৫তম আসিয়ান সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুহারা হবেন শুধু জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে। এর দায় কেউ এড়াতে পারবে না। এ সময় তিনি একটি তালিকাও উপস্থাপন করেন।

এতে বলা হয়, সংখ্যাগত বিচারে ক্ষতিগ্রস্তদের শীর্ষে থাকবে চীন। যার সংখ্যা অন্তত ৯ কোটি ৩০ লাখ। বাংলাদেশে ৪ কোটি ২০ লাখ। ভারতে ৩ কোটি ৬০ লাখ। ইন্দোনেশিয়ায় ২ কোটি ৩০ লাখ। এ ছাড়া বাকিরা জাপানসহ এশিয়ারই বিভিন্ন দেশের মানুষ। তবে জনসংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকবে বাংলাদেশ।

এদিকে নোবেল বিজয়ী জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইএসপিসিসির মতে, ২১০০ সালের অনেক আগেই আমরা এই দুর্যোগের মুখোমুখি হতে চলেছি। আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে ১৩ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে; যার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল পানির নিচে ডুবে গেলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অঞ্চলের কৃষি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে এ অঞ্চলের এক কোটি মানুষ। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা বাড়বে কয়েকগুণ। আগে ১০ থেকে ১৫ বছর পরে আসত সিডর, আইলা, হ্যারিকেন ও নার্গিসের মতো ঘূর্ণিঝড়। এখন প্রায় প্রতি বছর অথবা দু-তিন বছর ব্যবধানে তা ক্ষতবিক্ষত করছে বাংলাদেশকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যও তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিল ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিনে দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত-তাপমাত্রা, সবকিছুতেই আসছে আমূল পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের জন্য সবটুকুই ঋণাত্মক। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে কেবল বন্যাই হয়েছে ৫৩টি। যার মাঝে ৬টি ছিল মহাপ্লাবন। ১৫৩ বছরে হয়েছে ২০টি বড় ধরনের ভূমিকম্প।

১৯৬০-১৯৯৭-এর মাঝে ছোট-বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও কালবৈশাখীর সংখ্যা ছিল ১৬৭টি। সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি এবং কৃষি সম্পৃক্ত মানুষ। কেবল ২০০৭ সালের নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩ বিলিয়ন ডলার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের মাত্রা বাড়ারই ইঙ্গিত রয়েছে; যা দেশের জন্য একটি অশনিসংকেত।

সুতরাং এই অশনিসংকেত সামনে রেখে আমাদের সাবধানতা আমাদেরই গ্রহণ করতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ, সরকার এবং দেশের প্রত্যেকটি নাগরিককে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় সততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এবং তারা তা আসবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।

পিডিএসও/তাজ