দেশ-বিদেশে গৃহকর্মী নির্যাতন

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ১১:২৭

আবু আফজাল সালেহ

বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে বেশি গৃহিকর্মী যাচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যৌনদাসী হিসেবে বিবেচনা করে গৃহমালিক। বাবা-সন্তান মিলেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় এসেছে এমনও। ভারত থেকেও উল্লেখযোগ্য গৃহকর্মী সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে যায়। তবে তাদের ওপর নির্যাতনের হার একেবারেই কম। সৌদি আরবসহ অনেক দেশই মনে করে বাংলাদেশ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকারের শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে না বিধায় গৃহ নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে।

‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন’ আইটিইউসি ২০১২ সালে বাংলাদেশের গৃহকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, শুধু ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গৃহকর্মীর সংখ্যা ২০ লাখের মতো। এদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ নারী, যাদের অনেকে বয়সে শিশু কিংবা তরুণী।

আইটিইউসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ রাতে রান্নাঘরে ঘুমান। এ ছাড়া বসার এবং শোয়ার ঘরের মেঝেতে ঘুমান গড়ে ২০ শতাংশ করে গৃহকর্মী। কারো কারো আবার ঘুমাতে হয় স্টোর রুমে। অন্যায়, নির্যাতন অধিকাংশ গৃহকর্মী বা কাজের মেয়ে পড়ালেখার সুযোগ পান না। বিনোদনেরও অভাব রয়েছে। কমপক্ষে ৫৩ শতাংশ গৃহকর্মীর সঙ্গে বাজে ভাষায় কথা বলা হয়। কাজ হারানোর আতঙ্কও কাজ করে তাদের মধ্যে। যৌন নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মীর সংখ্যা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ২৫ লাখ গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিক আছেন। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে এমন শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার, যাদের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই মেয়েশিশু।

২০১৩ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলওর এক প্রতিবেদন বলছে, সারা বিশ্বে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫৩ মিলিয়ন। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই নারী। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি যে আরো কয়েক মিলিয়ন বেশি হতে পারে, সে কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে ১৫ বছরের কমবয়সি শিশু গৃহকর্মীদের সংখ্যা আইএলওর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি ২০০৮ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪ লাখ। আইনের বাইরে আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের গৃহকর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশই শ্রম আইনের সুবিধাবঞ্চিত। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক (৪৫ শতাংশ) গৃহকর্মী সাপ্তাহিক ছুটি পান না। তা ছাড়া তাদের এমন কোনো বার্ষিক ছুটি নেই, যার জন্য তাদের অর্থ প্রাপ্য (পেইড লিভ)। প্রসূতি সুরক্ষা প্রতি তিনজনের একজন গৃহকর্মী এই সুবিধা পায় না বলে জানিয়েছে আইএলও। এগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র। বাংলাদেশি প্রবাসী গৃহকর্মীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ক্ষেত্রমতে অনেক বেশি।

বাংলাদেশের গৃহশ্রমিকদের শতকরা ৫০ ভাগ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়। মামলা হলেও পরে চাপের মুখে সমঝোতা বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলাগুলো আর কার্যকর থাকে না। এটা বাংলাদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনে স্বীকৃতি থাকলে এমন অবস্থার উন্নতি হতো বলে মনে করি। ‘বাংলাদেশ লেবার আইন-২০০৬’-এ গৃহকর্মীকে শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন খুব কম। প্রতিকারের ব্যবস্থার ক্ষেত্রও কম। এ আইনটি ২০১৮ সালে সংশোধোনী আনা হলেও গৃহকর্মকে শ্রমের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এ আইনটি যথেষ্ট শক্তশালী। আইনে গৃহিকর্মীর শ্রমকে স্বীকৃতি দিলে সহজেই প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ হতো।

বাংলাদেশে গৃহকর্মী, দিনমজুর বা সাধারণ শ্রমিকদের জন্য নেই কোনো সুরক্ষা বা সুনির্দিষ্ট মজুরি। পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পে সরকার সর্বনিম্ন মজুরি বেঁধে দিলেও শ্রমিকদের বিশাল একটি অংশ অনিশ্চিত জীবনযাপন করে থাকে। বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন দেশে বা বিদেশে অনেক আছে। কিন্তু গৃহকর্মীদের কোনো ইউনিয়ন নেই। পাকিস্তানে অনেক ক্ষেত্রে গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। কিন্তু সে দেশের পাঞ্জাব সরকার একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়ে ২০১৪ সালে চালু করেছে ‘গৃহকর্মী ইউনিয়ন’। শুরুতে এতে মাত্র ২৩৫ জন সদস্য থাকলেও ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তবে দেশটির অন্যান্য অঞ্চলে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনো তা চালু হয়নি।

‘কাফালা’ নিয়ম চালু আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। পিকিউলার এ ব্যবস্থা থাকার কারণে গরিব দেশ থেকে সেখানে যাওয়া গৃহকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হলেও তাদের নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে না। কারণ কাফালা ব্যবস্থার কারণে নির্যাতিতরা চাইলেও নিয়োগদাতার ছাড়পত্র ছাড়া দেশ ত্যাগ করতে পারেন না। আইএলওর হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এ অবস্থাকে দাসত্বের নবরূপ বলা হয়। এটা মানবধিকারের চরম লঙ্ঘন। এর ফলে নির্যাতিত গৃহমালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার।

প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে বড় একটা অংশ হচ্ছে নারী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসীর মধ্যে ৭ লাখ ২৭৮ জন নারী রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া নারীদের ৮০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব। মোট কর্মীর ৩০ শতাংশই সে দেশে রয়েছেন। এসব নারী অভিবাসী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী, হাসপাতাল, পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কল-কারখানায় কর্মরত। পুরুষ কর্মীর তুলনায় উপার্জিত অর্থ নারীরা বেশি দেশে পাঠাচ্ছেন। যেখানে বেশির ভাগ পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৫০ ভাগ টাকা পাঠান, সেখানে গড়ে নারী শ্রমিকরা ৯০ ভাগ টাকা দেশে পাঠান বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

কিন্তু কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অন্তত ১ হাজার ৩৫৩ জন নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের প্রায় সবাই নির্যাতনের কারণে ফিরে আসার কথা বলেছেন। চলতি বছরের বছর প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে ফিরেছেন কমপক্ষে ৬৩৬ জন নারী গৃহকর্মী।

বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া, কর্মঘণ্টা বেশি, ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকার চিত্র প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশি নারীকর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কূটনীতি শক্তিশালী নয় বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছে। জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিকরা এখন বিদেশ যেতে পারছেন। কিন্তু জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিক পাঠানো সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও প্রত্যেক নারীকর্মী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দালালি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

দালালের মাধ্যমে নারীকর্মী সংগ্রহ করার কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর সার্ভিস চার্জের প্রাপ্ত অর্থ থেকে উল্লিখিত অর্থ দালালকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিপরীতে বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি। একটু ভালো থাকার আশায় তারা আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশে কাজ করতে যেতে চান। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে পাচারের শিকার কয়েকজন নারী জানান, বিদেশে অবস্থানকালে তাদের বৈদ্যুতিক শক, সিগারেটের আগুন দিয়ে ছেঁকাসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। পিপাসা পেলে বাথরুমের পানি ও ক্ষুধা পেলে বাসি-পচা খাবার খেতেন।

বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত নারীদের অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও দেশে ফিরছেন। জানা যায়, প্রবাসী নারীরা এসব বিষয়ে নানা অভিযোগ করলেও এগুলোর নি®পত্তির সংখ্যা হতাশাজনক। বিদেশের মাটিতে অসংখ্য নারীকর্মী কাজ করলেও তাদের সমস্যা এবং সহযোগিতার জন্য তেমন নেই কোনো শেল্টার হোম, দ্রুত সহযোগিতা পাওয়ার জন্য নেই হটলাইন। অনেক দেশেই নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে সহযোগিতা চাইলেও পাচ্ছেন না। কিছু ক্ষেত্রে নারীরা তাদের হেনস্তার কথা বলে না। লেবার উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তা কম থাকায় এমনটা হয়ে থাকতে পারে। ওমানের অনেক বাড়িতে বাংলাদেশি গৃহকর্মীরা বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এক প্রতিবেদনে জানায়। ভারত নেপাল শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো প্রবাসী গৃহশ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে অধিক কঠোর। তাদের চুক্তিপত্রে যথেষ্ট কঠোরতা দেখানো হয়।

সরকার নির্যাতনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা এজেন্সি চিহ্নিত করে ‘ব্ল্যাক লিস্টেড’ করতে পারে। আইনি সহায়তা দিতে হবে। বিদেশে নির্যাতিতদের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা দিয়ে তাদের দেশে ফেরত আনতে হবে। হাইকমিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের দুর্দশার কথা জানতে হবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মহিলা কর্মকর্তা/কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিকদের ‘শ্রমিক হিসেবে’ স্বীকৃতি ও শ্রম আইনে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নীতি তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে গৃহকর্মীদের অধিকারের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সমাজবিশ্লেষকরা।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

Email : [email protected]

পিডিএসও/তাজ