অনেক ঘটনা আজও রহস্যাবৃত

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৩১

রায়হান আহমেদ তপাদার

শতাব্দীর সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা নাইন-ইলেভেনের ১৪ বছর পার হতে চললেও আজও তার সঠিক তথ্য উপাত্ত বিশ্ব দরবারে অমলিন। নাইন-ইলেভেনের প্রসঙ্গ এলে প্রধানত যে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে তার একটি হলো কারা ঘটিয়েছিল এ ঘটনা? এবং নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বে যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করা হয়, আজ ১৪ বছর পর সেই যুদ্ধের ফলাফল কী? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করলেও মার্কিন প্রশাসন এ ব্যাপারে কিছু অনুমান নির্ভর ব্যাখ্যা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

আগে সংঘটিত কয়েকটি দেশের মার্কিন দূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলার কথা আল কায়দা স্বীকার করলেও নাইন-ইলেভেনের ঘটনার দায়িত্ব তারা কখনো স্বীকার করেনি। বরং ঘটনার পরপর ওসামা বিন লাদেন তাতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তাহলে প্রশ্ন, ওসামার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে নাইন-ইলেভেন কাদের কাজ এ রহস্য আজও উদ্ঘাটন হয়নি। বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ব-প্রভুত্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনেক শত্রুর জন্ম দেয়—তাতে শুধু রাষ্ট্রশক্তিই ছিল না, ছিল ধর্মীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংগঠনও, পরোক্ষে তাদের সৃষ্টির দায় যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের ফিলিস্তিনবিরোধী ও ইসরায়েলি তোষণনীতিও এর মধ্যে পড়ে। তা ছাড়া রয়েছে আঞ্চলিক যুদ্ধের উসকানি, সোভিয়েত বিরোধিতার সূত্রে আগ্রাসী নীতি ইত্যাদি। অস্বীকার করা যাবে না যে, জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানকে হাতের মুঠোয় নিয়ে অর্থ ও অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান করে তোলে ওয়াশিংটন মূলত পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে।

একই কারণে সীমান্ত সংলগ্ন চীনেরও আগ্রহী নজর পাকিস্তানের দিকে। তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়নের যা পরবর্তীকালের রাশিয়ার। কে অস্বীকার করতে পারবে যে পাকিস্তানে তালেবান যোদ্ধা তৈরির নেপথ্য শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকান বিমান ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা নিউইয়র্কের ট্রেড সেন্টারের বিখ্যাত টুইন টাওয়ারে হামলা চালায়। সেসঙ্গে চেষ্টা শাসন শক্তির কেন্দ্র হোয়াইট হাউসের সন্নিকটে পেন্টাগনে আঘাত হানার, যদিও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। কিন্তু টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত। কয়েক হাজার কর্মরত নিরপরাধ নর-নারীর মৃত্যু এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, যা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আঘাত বলেও মানবিক যুক্তিতে সমর্থনযোগ্য নয়। কারা এ দুঃসাহসী বিমান ছিনতাইয়ের নায়ক, অর্থাৎ কী তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, কী তাদের সঠিক উদ্দেশ্য—এসব নিয়ে আজ পর্যন্ত রহস্যের জট খোলা যায়নি। যায়নি অনেক তদন্ত, অনেক বিচার-বিশ্লেষণ সত্ত্বেও। শুধু অনুমান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণার নামে হরেক রকম গবেষণার সিদ্ধান্ত। এখনো সবই রহস্য, সবই ধোঁয়াশা, যতই ওসামাকে দায়ী করা হোক না কেন। দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, ধ্বংস হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিষয়-সম্পদ, সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্য। এসব ভয়াবহতা বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি যুক্তরাষ্ট্রকে, যদিও তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এর বড় কারণ যুদ্ধ দুটি ছিল মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক, সেসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ জাপান।

আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইউরেশিয়ার বিপরীত ভূপৃষ্ঠে। তাই ধ্বংসযজ্ঞের আগুন থেকে অনেক দূরে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের উপলব্ধিতে তারা অজেয়; সমর শক্তিতে ও অর্থশক্তিতে এতটা বলীয়ান যে মাঝেমধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও তাদের অবস্থান অতুলনীয়।

ইদানিং চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি সত্ত্বেও বলা হয়ে থাকে যে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের উল্লিখিত একাধিপত্য অতিক্রম করতে পারেনি। এমন এক অনন্য অবস্থার সহায়ক প্রেক্ষাপট হলো একটি বিশাল মহাদেশের ভূসম্পদ এবং এর আর্থ-রাজনৈতিক সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের হাতের মুঠোয়। এমন দুর্লভ সুযোগ-সুবিধা কার ভাগ্যে মেলে? তাই তাদের শক্তির স্পর্ধা ঔদ্ধত্যে বলীয়ান। যুক্তি সেখানে পরাজিত। তারা বিশ্বমোড়ল হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করতে অভ্যস্ত। তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণে যেকোনো দেশের প্রতি আগ্রাসী থাবা চালাতে দ্বিতীয় চিন্তা করে না। কারণ তারা জানে, তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করে এমন শক্তি বিশ্বে কারো নেই। তারা বিশ্ব শাসন করবে এটাই স্বাভাবিক। অর্থশক্তি, অস্ত্রশক্তি, সর্বাধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক শক্তিতে তারা সবার ঊর্ধ্বে। সোভিয়েত সামরিক শক্তি একসময় তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিল; এখন চীনের চেষ্টা অর্থশক্তিতে সেই পথের যাত্রায়। কিন্তু দিল্লি দূর-অস্ত এমনকি কিউবাকে কেন্দ্র করে একসময় ক্রুশ্চেভ-কেনেডির মিসাইল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকে বিচলিত করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত যুক্তিবাদী চিন্তার সংযম উভয়কে নিবৃত্ত করে, যা হুমকিতেই শেষ হয়। কিন্তু সন্ত্রাসবাদী শক্তি তো যুক্তি মানে না। অজেয় স্পর্ধার ঔদ্ধত্য ভাঙতে আত্মঘাতী হামলায় পিছপা হয় না, পিছু হটে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থশক্তির কেন্দ্র নিউইয়র্কেও যে আঘাত হানা যায়, প্রমাণ করা যায় যুক্তরাষ্ট্র আঘাতের ঊর্ধ্বে নয়—সেই সত্যটাই প্রমাণ করে নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলা। সেপ্টেম্বর হয়ে উঠে নাইন-ইলেভেনের প্রতীক। অন্যদিকে পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন আফগানিস্তানে সোভিয়েত আধিপত্য নষ্ট করার সামরিক পরিকল্পনার প্রধান নায়ক তো যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান শিখণ্ডী তালেবান যোদ্ধা তৈরি করতে দিয়ে স্বার্থ ছিল চীনেরও।

এমনকি ইসলামী মৌলবাদী শক্তিগুলোকে এ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ করা পাকিস্তানের মাধ্যমে। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার এবং অনুরূপ একাধিক মৌলবাদী নেতা থেকে ভাড়াটে উজবেক সামরিক নেতা—কে না যোগ দিয়েছে এ যুদ্ধে আফগানিস্তানকে অগ্নিগর্ভ নরকে পরিণত করতে? বাংলাদেশ থেকেও মৌলবাদী যোদ্ধা ব্যক্তিগত আগ্রহে এ সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। স্বভাবতই বিজয় অনিবার্য। আফগানিস্তান অগ্নিকুণ্ডে পরিণত। এ যুদ্ধে পরে ধনাঢ্য সৌদি নাগরিক ওসামা বিন লাদেন যুক্ত। সেই যে সোভিয়েত প্রভাব দূর করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাবুলে আগুন জ্বালানো হয় (১৯৯২), আফগান প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তার জের এখনো মেটেনি। কাবুল এখনো জ্বলছে—প্রায়ই আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিরীহ মানুষের মৃত্যু এক নিয়মিত ঘটনা। সেসঙ্গে জ্বলছে পাকিস্তানও। তালেবানি শক্তি এর মূলে। সেই সূত্রে জন্ম নিয়েছে একাধিক সশস্ত্র ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী তালেবান, আল-কায়েদা থেকে অতি সাম্প্রতিক আইএস (ইসলামিক স্টেট) উৎস আফগান যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ বিস্তারের উদ্দেশ্যে। সেখানে শুধুই ক্ষমতার পালাবদল, হত্যা আর আগুন। নিরাপদ নয় মার্কিন সেনারাও। তারা এখন পিছু হটতে ইচ্ছুক। আশ্চর্য মার্কিনবিরোধী তালেবানদের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে আগ্রহী ক্ষমতার ভাগাভাগিতে। ইরাকের সাফল্য এখানে ধরা দেয়নি। এসব অনেক পরের কথা।

এখন আবারও প্রশ্ন? টুইন টাওয়ারে আঘাত করল কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী? যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদাকে। কিন্তু বিশ্বের কাছে এর হিসাব-নিকাশ ভিন্ন। এ ঘটনার পরপরই লাদেনের ঘোষণা—এ ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক, সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনদের ঘরে আঘাত করার জন্য তিনি তাদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তি হচ্ছে; ওসামার আল-কায়েদাই যদি নাইন-ইলেভেনের নায়ক হবে, তাহলে প্রকাশ্য বিবৃতিতে এমন কথা বলবেন কেন ওসামা। তার এ বিবৃতি ছিল কৌশলগত দিক থেকে আত্মঘাতী ভুল, যে জন্য তাকে সিআইএর কৃতিত্বে এবং পাকিস্তান আর্মির একাংশের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রাণ দিতে হলো নিরস্ত্র অবস্থায়। এ হত্যা নিয়েও তখন বিস্তর সমালোচনা ছিল নিরস্ত্র আত্মসমর্পণকারীকে হত্যার জন্য। সে ক্ষেত্রে আরো একটি সম্ভাবনা ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। এ ঘটনা অতি বুদ্ধিমান ইসরায়েলের। যুক্তি ছিল সেই ভয়ংকর দিনটিতে টুইন টাওয়ারে বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ মারা গেলেও একজন ইহুদিরও মৃত্যু ঘটেনি। তারা সেদিন কাজে যোগ দেয়নি কোনো গোপন পূর্ব ইঙ্গিতে? এটাও কিছু মাত্রায় ধোপে টেকে না। ছড়ানো-ছিটানো ইহুদিকর্মীদের আগেই গোপন সংবাদ সরবরাহ কি সম্ভব প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে? অনেকে বলেন, ইহুদি ও ইসরায়েলি শাসকদের পক্ষে সবই সম্ভব। অসম্ভব তাদের মেধা, বুদ্ধি, কৌশলী বিচক্ষণতা। না হলে ছোট্ট ইসরায়েল মিসরসহ এতগুলো সম্মিলিত আরব রাষ্ট্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারে? পেরেছিল তো। তবে লেবাননি হিজবুল্লাহদের দমাতে পারেনি, যদিও মারতে পেরেছে গোপন বিষ প্রয়োগে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতকে, যাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতে না পারে। কিছু মার্কিন-ইসরায়েলি নেতার আপাত সদিচ্ছা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা উদ্বাস্তুই থেকে গেল।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল