দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্ত পদক্ষেপ

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৩৯

সম্পাদকীয়

 

আমাদের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেকটা পরমাত্মীয়ের মতো মাঝেমধ্যেই অতিথি হয়ে আসে। কোনো নোটিস থাকে না, থাকে না কোনো দাওয়াতপত্র, আচমকাই হাজির। গবেষণা বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫১টি বড় দুর্যোগ আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়িয়েছে। আমরা কতটা যতœ নিতে পেরেছি তার কোনো হিসাব না থাকলেও তাদের আসা-যাওয়ার মাঝে ৬৮ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ১০ বছরে এ দেশের মানুষকে ১৬ দফায় বন্যাকে স্বাগত জানাতে হয়েছে। এই বন্যায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৭ মানুষ। আর ঠিক এ মুহূর্তে আমরা বন্যাকে আলিঙ্গন করেই বেঁচে আছি। ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ১৩ লাখ ৪২ হাজার মানুষ।

বন্যা ও ঝড়ের মতো দুর্যোগতো আছেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শৈতপ্রবাহ থেকে শুরু করে ভূমিধসের কারণেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতির শিকার হয়েছে। সুইডেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রাউল ওয়ালেনবার্গ ইনস্টিটিউট (আরডব্লিউআই) এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২ এবং সরকারের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা ও কৌশলপত্রে বাস্তুচ্যুত মানুষের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি দেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তারও কোনো হিসাব নেই। তবে জলবায়ুবিষয়ক পরিকল্পনা ও কৌশলপত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সতন্ত্র সংস্থা গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের আইনি সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে একটি আলাদা আইন প্রণয়ন করতে হবে। দেশের জনগণ সংবিধানে যেসব অধিকার ভোগ করেন, বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোকেও একই ধরনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ তাদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের পরিমাণ বাড়ছে এবং সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়তে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের সুরক্ষা ও অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়- এ নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।

আমরা জানি, এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা আছে এবং সে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা তাদের কর্মকান্ড পরিচালনাও করছে। তবে তাদের এ কর্মকান্ড যে পর্যাপ্ত নয় তা ৬৮ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আমরা মনে করি, কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে। এই ফাঁক চিহ্নিত করতে হবে। ফাঁক বন্ধ করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে বিষয়টির মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, এ সমস্যা অস্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। সমস্যাটি স্থায়ী এবং আমাদের জীবনের একটি অংশ হিসেবেই বিবেচিত। দুর্যোগকে যখন বাংলাদেশের মানুষ পরমাত্মীয় হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছে, তখন পরিত্যাগের কথা না ভেবে সহাবস্থানের কথা চিন্তা করাটাই শ্রেয়। আর সে কারণেই বাস্তুচ্যুত মানুষের দিকে আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিকে আরো ঘনীভূত করা দরকার।

পিডিএসও/রি.মা